দেশি-বিদেশি শিল্প-কারখানায় সমৃদ্ধ এবং প্রবাসী-অধ্যুষিত অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে নিয়মিত বিমান চলাচল বন্ধ রয়েছে কুমিল্লা বিমানবন্দরে। তবে ফ্লাইট চলাচল না করলেও সচল রয়েছে এই বন্দরের বিভিন্ন কার্যক্রম। বর্তমানে সিগন্যাল ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতি মাসে সরকার আয় করছে প্রায় আড়াই কোটি টাকার রাজস্ব। রানওয়ে কার্পেটিং, ফায়ার ব্রিগেড ও ভিএইচএফ সেট স্থাপন করলেই এই বন্দর থেকে পুনরায় অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান চলাচল শুরু করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
regional যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, পর্যটন সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকার দেশের আটটি আঞ্চলিক বিমানবন্দর পুনরায় চালুর মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে কুমিল্লা বিমানবন্দরও। তালিকায় থাকা বাকি সাতটি বিমানবন্দর হলো—বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, ঈশ্বরদী, শমশেরনগর (মৌলভীবাজার), খানজাহান আলী (বাগেরহাট) এবং পটুয়াখালী বিমানবন্দর।
ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা
কুমিল্লা বিমানবন্দর সূত্রে জানা যায়, ১৯৪০ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নেউরা-ঢুলিপাড়ার পাশে এই বিমানবন্দরটি স্থাপিত হয়। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ রুটে সেনাবাহিনী এটি ব্যবহার করার পর একই বছর তা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এরপর ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত টানা ১০ বছর বিমান ওঠানামা করলেও পরবর্তীতে যাত্রীসংকটে তা বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৯৪ সালে পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও পর্যাপ্ত যাত্রীর অভাবে মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে তা আবার বন্ধ হয়ে যায়।
বর্তমানে ৭৭ একর ভূমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই বিমানবন্দরের বেশিরভাগ এলাকাজুড়ে গরুর ঘাস চাষ ও ছোট ছোট পুকুর রয়েছে। রানওয়ের পিচ উঠে পাথরের কণা ভেসে গেছে এবং জন্মেছে আগাছা। এছাড়া টেক-অফ ও ল্যান্ডিংয়ের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিয়ম ভেঙে বহু আবাসিক ভবন গড়ে উঠেছে, যা ভবিষ্যতের জন্য বড় বাধা বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে ২৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী তিন শিফটে এই বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালন করছেন।
সিগন্যালেই মাসে আয় আড়াই কোটি টাকা
বিমান ওঠানামা বন্ধ থাকলেও এই বন্দরের ডিভিওআর (DVOR) ও ডিএমই (DME) সিগন্যাল ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক আকাশপথে চলাচল করছে বিভিন্ন দেশের বিমান। প্রতিদিন ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের অন্তত ২৫ থেকে ৩০টি প্লেন এই সিগন্যাল ব্যবহার করে। বিশেষ করে ভারতের অভ্যন্তরীণ রুটের বিমান এবং আগরতলা বিমানবন্দরে যাওয়ার ফ্লাইটগুলো এই রুট বেশি ব্যবহার করে। এর মাধ্যমে প্রতি মাসে সরকারের প্রায় আড়াই কোটি টাকা রাজস্ব আয় হচ্ছে।
ইকোনমি ও প্রবাসীদের প্রত্যাশা
কুমিল্লা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ইপিজেড) দেশি-বিদেশি ৪৬টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান পণ্য উৎপাদন করছে। শুধু ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই এখান থেকে ৯০২.২২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। ইপিজেডের ব্যবসায়ীদের মতে, বিমানবন্দরটি চালু হলে বিদেশি বিনিয়োগ আরও বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া কুমিল্লা একটি বৃহৎ প্রবাসী-অধ্যুষিত এলাকা। গত পাঁচ বছরে এই জেলা থেকে সাড়ে ৪ লাখেরও বেশি মানুষ বিদেশে পাড়ি জমালেও তাদের অধিকাংশকেই যাতায়াতের জন্য ঢাকা বা চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ব্যবহার করতে হয়, যা সময় ও ব্যয় উভয়ই বাড়িয়ে দেয়।
কুমিল্লার ইতিহাসবিদ ও গবেষক আহসানুল কবীর এবং কুমিল্লা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ডা. আজম খান নোমানসহ স্থানীয় বিশিষ্টজনেরা মনে করেন, সামান্য কিছু বিনিয়োগের মাধ্যমেই কুমিল্লা বিমানবন্দর পুনরায় চালু করা সম্ভব। এটি চালু হলে অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি ও প্রত্যাশা দূর হবে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
কুমিল্লা বিমানবন্দরের সিএনএস প্রকৌশলী মো. নাসির উদ্দিন আহমদ জানান, রানওয়ের কার্পেটিং, ফায়ার ব্রিগেড, টাওয়ারে ভিএইচএফ সেট স্থাপন এবং কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হলেই অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান চলাচলে আর কোনো বাধা থাকবে না। তবে অপরিকল্পিতভাবে বিমানবন্দরের চারপাশে ভবন নির্মাণ ভবিষ্যতে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
এদিকে, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক জানিয়েছেন, দেশের অব্যবহৃত বিমানবন্দরগুলো পুনরায় চালুর একটি প্রস্তাব ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।