নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে সদস্য দেশগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’ গৃহীত হয়েছে। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই ঘোষণাটি আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরেন। ব্রিকস প্রতিষ্ঠার দুই দশক পূর্তির এই আয়োজনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংসহ জোটের বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন।
ঘোষণায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদসহ বৈশ্বিক বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। মোদি বলেন, পরিবর্তনশীল বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পুরোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার অপরিহার্য। তিনি প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, কার্যকরভাবে সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা এবং নিয়ম প্রণয়নের ক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। এছাড়া আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর পক্ষেও অবস্থান নিয়েছে জোটটি।
নিরাপত্তা পরিষদে ভারত ও ব্রাজিলের আরও বড় ভূমিকার আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন জানিয়েছে চীন ও রাশিয়া। দেশ দুটির আরও বেশি প্রতিনিধিত্বের পক্ষেও তারা ইতিবাচক অবস্থান ব্যক্ত করেছে। এছাড়া ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির বিকাশ ও তা পরিচালনার নিয়ম তৈরিতে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন নরেন্দ্র মোদি।
বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের পরিবর্তে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে। এছাড়া বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সংস্কারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে জোটটি একটি উন্মুক্ত, স্বচ্ছ ও নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
বৈশ্বিক বাণিজ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ঘোষণায় বলা হয়েছে, বহুপাক্ষিক বাণিজ্যব্যবস্থা দীর্ঘ সময় ধরে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ডব্লিউটিওর নিয়মের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বাণিজ্য-সীমাবদ্ধতামূলক পদক্ষেপ বৈশ্বিক বাণিজ্য কমিয়ে দিতে পারে। নির্বিচারে শুল্ক ও অশুল্ক ব্যবস্থা বাড়ানো এবং পরিবেশগত লক্ষ্য অর্জনের অজুহাতে সুরক্ষাবাদী নীতি গ্রহণের বিষয়েও জোটটি সতর্ক করেছে। এসব বাণিজ্যবাধা মোকাবিলায় সদস্য দেশগুলো সম্মিলিতভাবে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে নাবিকদের নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক নৌচলাচল নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে ব্রিকস। একই সঙ্গে জোটটি সব ধরনের ‘একতরফা যুদ্ধ কর্মকাণ্ডের’ নিন্দা জানিয়েছে।
সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে ব্রিকস জানিয়েছে, এর উদ্দেশ্য, স্থান বা হামলাকারী যে-ই হোক না কেন, সব ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অপরাধমূলক ও অগ্রহণযোগ্য। ঘোষণায় ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পাহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। ওই হামলায় ২৬ জন নিহত এবং অনেকে আহত হয়েছিলেন।
জোটটি সীমান্তপাড়ের সন্ত্রাসীদের চলাচল, সন্ত্রাসে অর্থায়ন এবং সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়ের মতো বিষয়গুলো নির্মূলে অঙ্গীকারবদ্ধ। ঘোষণায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সন্ত্রাসবাদকে কোনো ধর্ম, জাতীয়তা, সভ্যতা বা জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত করা উচিত নয়। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তি ও তাদের সহযোগীদের জবাবদিহির আওতায় এনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।
নরেন্দ্র মোদি বলেন, নয়াদিল্লি ঘোষণা ব্রিকসের সম্মিলিত অঙ্গীকার বাস্তবায়নের একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা। এখন এসব সিদ্ধান্তকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব সদস্য দেশগুলোর ওপর বর্তায়।