ইয়েমেনে হুথিদের সঙ্গে সংঘাতের মাত্রা নতুন করে বেড়ে যাওয়ায় সৌদি আরব এক জটিল পরিস্থিতির মোকাবিলা করছে। এখনকার সংকট কেবল ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সৌদি ভূখণ্ডের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। রিয়াদের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—এই আঞ্চলিক সংঘাত যেন সীমান্ত পেরিয়ে আরও ছড়িয়ে না পড়ে এবং দেশটির ভিশন ২০৩০-এর মতো বৃহৎ প্রকল্পগুলোতে কোনো বাধা তৈরি না হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে আবহা, খামিস মুশাইত, জিজান ও নাজরান এলাকায় হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলার ঘটনা দেশটির উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এসব হামলায় অসংখ্য বেসামরিক মানুষ আহত হয়েছেন এবং নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় আগুনের ঘটনাও ঘটেছে। বিশেষ করে জ্বালানি অবকাঠামোয় আঘাত আসায় অর্থনৈতিক কার্যক্রমে সাময়িক স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদাব নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে হুথিদের হুমকি বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।
সৌদি আরবের জন্য এই পরিস্থিতি একটি কঠিন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে দেশটি ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপ কমিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটার চেষ্টা করছিল। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের দিকে পুনরায় ধাবিত হলে বিপুল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক খরচের দায়ভার সরকারকে বহন করতে হবে। তবে একই সঙ্গে নিজের ভূখণ্ডে বারবার হামলা মেনে নেওয়াও রিয়াদের জন্য কৌশলগতভাবে অসম্ভব।
এক দশক আগের তুলনায় বর্তমানে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেক বেশি শক্তিশালী। দেশটি তার বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজিয়েছে এবং ড্রোন মোকাবিলায় সক্ষমতা অর্জন করেছে। তবুও হুথিদের হাতের আধুনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সরবরাহ নিয়মিত বাড়ায় রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বাড়ছে। শুধুমাত্র আকাশ প্রতিরক্ষার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই শতভাগ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
রিয়াদের বর্তমান কৌশলগত লক্ষ্য হওয়া উচিত শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলা, যাতে হুথিরা বুঝতে পারে যে সৌদি ভূখণ্ডে হামলার পরিণতি তাদের জন্য অসহনীয় হবে। এর জন্য সরাসরি বড় আকারের সামরিক অভিযান শুরু করার বদলে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার মতো বিকল্প পথে এগোতে পারে তারা।
অর্থনৈতিক দিক থেকে দেখলে, তেল অবকাঠামোয় যেকোনো হামলা বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি করে। সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০-এর পরিকল্পনা মূলত পর্যটন, প্রযুক্তি এবং তেলের বাইরের বিভিন্ন প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল। এসব প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করে বিদেশি বিনিয়োগকারী ও লজিস্টিকস খাতের আস্থার ওপর। ক্রমাগত হামলার ফলে বিমা ও পরিবহন খরচ বেড়ে গেলে বিনিয়োগকারীদের ধারণায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
লোহিত সাগরের নিরাপত্তা সৌদি আরবের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাব আল-মানদাব প্রণালি ভারত মহাসাগর ও সুয়েজ খালের সংযোগস্থল হিসেবে বৈশ্বিক অর্থনীতির লাইফলাইন। এখানে বিঘ্ন ঘটলে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়বে এবং অনেক ক্ষেত্রে জাহাজগুলোকে আফ্রিকা ঘুরে যাওয়ার বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হবে। যদিও পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের টার্মিনালে জ্বালানি পাঠানোর সুবিধা রিয়াদের কাছে রয়েছে, তবুও সামগ্রিক নিরাপত্তা ঝুঁকি থেকে দেশটি মুক্ত নয়।
রাজনৈতিক ঝুঁকির ক্ষেত্রে, হুথিরা সংঘাতকে সরাসরি সৌদি আরব বনাম ইয়েমেনের লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়, যা রিয়াদের জন্য কূটনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এ কারণে হুথিদের অগ্রযাত্রা প্রতিরোধের মূল দায়িত্ব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকার ও তাদের বাহিনীকে নিতে হবে। সৌদি আরব কেবল রাজনৈতিক, গোয়েন্দা ও প্রতিরক্ষা সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে তাদের পাশে দাঁড়াতে পারে।
ভবিষ্যতে সৌদি আরবের নীতি হওয়া উচিত সীমিত কিন্তু সুনির্দিষ্ট চাপের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা। এর মধ্যে রয়েছে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ইয়েমেনি বাহিনীকে শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে লোহিত সাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে আলোচনার পথ উন্মুক্ত রেখে একটি টেকসই রাজনৈতিক সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়াই রিয়াদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে।
পরিশেষে, সৌদি আরব ও ইয়েমেন কারোই আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা নেই। তবে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে রিয়াদকে একদিকে যেমন সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন করতে হবে, তেমনি কূটনীতির সুযোগও বজায় রাখতে হবে। সৌদি ভূখণ্ডে যেকোনো হামলার যে চড়া মূল্য দিতে হবে—এই বার্তা স্পষ্ট করাই বর্তমান কৌশলগত সংকটের উত্তরণের চাবিকাঠি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সাম্প্রতিক হুথি হামলাগুলোতে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফলে সৌদি আরব এখন দুটি পরস্পর-সম্পর্কিত হুমকির মুখে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আবার দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে ফিরে গেলে সেই কৌশল ভেস্তে যাবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সামরিক ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায়ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অর্থাৎ সৌদি আরবকে নিষ্ক্রিয় থাকা কিংবা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে ফিরে যাওয়া—এই দুটি পথের একটিকে বেছে নিতে হবে না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বড় জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ।