দেশের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির বাজারে দীর্ঘ সময় ধরে চলছে চরম অস্থিরতা। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসে গ্যাসের যে খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দিচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি দামে বাজারে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে ১২ কেজির প্রতিটি সিলিন্ডারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারিত থাকলেও, গ্রাহকদের বাধ্য হয়ে ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হচ্ছে। এতে প্রতিটি সিলিন্ডারে একজন সাধারণ গ্রাহককে বাড়তি গুনতে হচ্ছে ২৬০ থেকে ৫০০ টাকার বেশি, যা নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও অবৈধ মজুদ না করতে ব্যবসায়ীদের সতর্ক করা হয়। কিন্তু বাজারে সেই মূল্য কার্যকর না হলে ভোক্তারা নির্ধারিত দামের সুফল পান না।
জ্বালানি বিভাগের নির্দেশে দেশের জেলা প্রশাসকরা এলপিজির বাজার পরিস্থিতির ওপর যে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন, তা গত ৮ অক্টোবর জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, সারা দেশেই নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস বিক্রি হচ্ছে। মানিকগঞ্জে এই সিলিন্ডার ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায়, বগুড়ায় ১ হাজার ৮২০ থেকে ২ হাজার ১০০ টাকায়, কুমিল্লায় ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ১০০ টাকায় এবং খুলনায় ১ হাজার ৯০০ থেকে ১ হাজার ৯৫০ টাকায় বিক্রি হওয়ার তথ্য মিলেছে। অক্টোবর মাসে সেখানে ১১টি অভিযান পরিচালনার তথ্যও প্রতিবেদনে রয়েছে।
এছাড়া সাতক্ষীরায় ১ হাজার ৮৪০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা, ফেনীতে ১ হাজার ৮৪০ থেকে ১ হাজার ৯৫০ টাকা, মাদারীপুরে ১ হাজার ৮৪০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকা, রাঙামাটিতে ১ হাজার ৮০০ থেকে ১ হাজার ৮৪০ টাকা, রাজশাহীতে ১ হাজার ৮৪০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা, বরিশালে ১ হাজার ৮২০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা, ঝিনাইদহে ১ হাজার ৮৫০ টাকা এবং নরসিংদীতে ১ হাজার ৮৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে ১২ কেজির সিলিন্ডার। এই তথ্য স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, শুধু জেলাভেদে নয়, বরং এক জেলাতেই বিক্রেতাভেদে দামের ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। এসব তথ্য থেকে দেখা যায়, একই পণ্যের দাম একেক জেলায় যেমন আলাদা, তেমনি একই জেলার মধ্যেও বিক্রেতাভেদে দামের বড় পার্থক্য রয়েছে।
বাজারের এই অনিয়ম রুখতে দেশের বিভিন্ন স্থানে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। অভিযানে জরিমানা করা হলেও বেশি দামে বিক্রির প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। খুলনায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বিএসটিআই ও পুলিশের যৌথ অভিযানে চারটি প্রতিষ্ঠানকে ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া মাদারীপুরে তিনটি দোকানে ৫ হাজার টাকা, রংপুরে ৩ হাজার টাকা এবং সাতক্ষীরায় সেপ্টেম্বর মাসে ১০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এছাড়াও প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শকের দপ্তর থেকে অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগে নয়টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৬১ হাজার টাকা জরিমানা করার তথ্য পাওয়া গেছে। মাদারীপুরে অতিরিক্ত দামে সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগে তিনটি দোকানকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর আওতায় মোট ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। রংপুরে এক ব্যবসায়ীকে একই আইনের ৪০ ধারায় জরিমানা করা হয় ৩ হাজার টাকা।
বিইআরসির চেয়ারম্যান মো. জালাল আহমদ জানান, সংস্থাটি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই মাসিক মূল্য নির্ধারণ করে। তবে বাজার তদারকির জন্য পর্যাপ্ত জনবল তাদের নেই। নির্ধারিত দামে বিক্রি নিশ্চিত করা এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব মূলত জেলা প্রশাসনের ওপর। তিনি জানান, বিইআরসির নিজস্ব কর্মকর্তারাও ১৩ অক্টোবর থেকে মাঠে তদারকিতে নামবেন। পাশাপাশি শিল্পকারখানায় এলপিজির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহের ওপর কিছুটা চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ফলে বাজারে তাদের সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের এলপিজি বাজার মূলত গুটিকয়েক বেসরকারি আমদানিকারকের কব্জায়। হাতেগোনা ছয়-সাতটি কোম্পানি দেশের আমদানির সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করে। ডিলারশিপ ব্যবস্থাও তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় মাঠপর্যায়ে সরকারের তদারকি বা নিয়ন্ত্রণ সীমিত। এই নিয়ন্ত্রণহীনতার ফলেই ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণের সুযোগ পাচ্ছেন। জ্বালানি বিভাগ এখন এলপিজি খাতে সরকারি অংশীদারত্ব বাড়ানো এবং ডিলারদের ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নিয়মিত নজরদারি ও জরিমানার পাশাপাশি পুরো সরবরাহব্যবস্থার তথ্য যাচাই করা জরুরি। আমদানিকারক থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করলে এবং একই অপরাধ বারবার করা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা না নিলে সাধারণ ভোক্তারা স্বস্তি পাবেন না। হোটেল-রেস্তোরাঁ ও সাধারণ পরিবারগুলোর ওপর এই বাড়তি ব্যয়ের চাপ কমাতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রণে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ভূমিকা, সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।