ন্যায্য রূপান্তরের লক্ষ্য সামনে রেখে জ্বালানি নীতি ও সুশাসন নিশ্চিত করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, পাশাপাশি উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো তৈরিতে বিশেষ জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে তারা জ্বালানি রূপান্তরের ক্ষেত্রে সামাজিক ও পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন।
বুয়েট কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত ‘রিনিউয়েবল এনার্জি ফেস্ট ২০২৬’ এর সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘একটি ন্যায্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সবুজ জ্বালানি রূপান্তর’ প্রতিপাদ্য নিয়ে দেশে দ্বিতীয়বারের মতো এ উৎসবের আয়োজন করা হয়। একশনএইড বাংলাদেশ, বুয়েট, জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ এবং বুয়েটের ইনস্টিটিউট অব এনার্জি অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট যৌথভাবে এই মেলার আয়োজন করে। তরুণদের নেতৃত্বে ‘ফ্রম কমিউটমেন্ট টু কমিউনিটিঃ অ্যাডভান্সিং এ জাস্ট এনার্জি ট্রান্সজিশন থ্রু বাংলাদেশ এনডিসি ৩.০’ শীর্ষক সংলাপ আয়োজন করা হয়। এছাড়াও, শেষদিনে ‘রিনিউয়েবল এনার্জি ইনোভেশন, টেকনোলজি অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার’, ‘সোশ্যাল-ইনভায়রনমেন্টাল সেফগার্ড অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি অব রিনিউয়েবল এনার্জি’ এবং ‘এনার্জি পলিসি অ্যান্ড গভরন্যান্স ফর এ জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক আরও তিনটি আলাদা প্যানেল আলোচনা।
এবারের উৎসবের সমাপনী দিনে ১২-দফা ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হয়। ঘোষণাপত্রে একটি স্বতন্ত্র নবায়নযোগ্য জ্বালানি আইন প্রণয়ন, সৌরশক্তির বড় পরিসরে সম্প্রসারণ, স্মার্ট অবকাঠামো ও ব্যাটারি স্টোরেজের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিড আধুনিকায়ন এবং গ্রিন ফাইন্যান্স সংগ্রহের নানা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মূল শিল্পখাতগুলোতে কার্বন নিঃসরণ কমানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। একইসাথে, দেশিয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, তরুণ প্রজন্মের দক্ষতা উন্নয়ন ও পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মূল শিল্পখাতগুলোয় কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। প্যানেল আলোচনা থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবকাঠামো উন্নয়নে জাতীয় নীতিমালা ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, কার্যকর ট্যারিফ ব্যবস্থা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
প্রযুক্তি ও অর্থায়নের পাশাপাশি ঘোষণাপত্রটিতে সামাজিক ন্যায্যতা ও জবাবদিহিতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এতে একটি জেন্ডার-সংবেদনশীল ও কমিউনিটি-নেতৃত্বাধীন জ্বালানি রূপান্তরের দাবি জানানো হয়, যেখানে নারী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, শ্রমিক ও প্রান্তিক মানুষের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া জলবায়ু অর্থায়নে স্বচ্ছতা, স্বাধীন পরিবেশগত ও সামাজিক পর্যবেক্ষণ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষা কাঠামো প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হয়।
উৎসবের শেষ দিন সকাল থেকেই দর্শনার্থীরা মেলায় দেশীয় উদ্ভাবকদের তৈরি নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ক অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের পণ্য ও সেবা ঘুরে দেখেন। পাশাপাশি জাতীয় ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় উচ্চপর্যায়ের একাধিক প্লেনারি ও প্যারালাল সেশন অনুষ্ঠিত হয়। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আগত বিশেষজ্ঞরা এসব সেশনে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে ন্যায়সংগত জ্বালানি ভবিষ্যতের গল্প তুলে ধরেন কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটার।
তরুণদের অংশগ্রহণে আয়োজিত প্যানেল আলোচনায় বক্তারা বায়ুদূষণ রোধে কার্যকর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং তাপমাত্রা মোকাবিলায় সৌরচালিত সেচব্যবস্থা ও আইওটি প্রযুক্তির মতো উদ্ভাবনী সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেন। আগামী এক বছরে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং সবুজায়নে সম্পৃক্ত করতে কার্যকর রোডম্যাপ প্রণয়নের দাবি জানান তারা। শায়লা শবনম রিচির সঞ্চালনায় এই প্যানেল আলোচনায় বক্তারা বলেন, বায়ুদূষণ ও ধুলাবালি কমাতে কার্যকর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির অর্থায়ন ও বিনিয়োগ বিষয়ক প্যানেল আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন খান। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি তানজিনা দিলশাদ, গ্রিনার গার্মেন্টস ইনিশিয়াটিভের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নুরে আলম এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স বিভাগের পরিচালক একেএম নুরুননবী।
অনুষ্ঠানে সমাপনী দিনে উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি খাতে বিশেষ অবদান রাখায় তিনটি প্রকল্পকে পুরস্কৃত করা হয়। এর মধ্যে ফেলাইট প্রকল্প প্রথম স্থান অধিকার করে। এছাড়া কার্বন ক্রেডিট বিডি দ্বিতীয় এবং আইইউবি ফর্মুলা-ই প্রকল্প তৃতীয় স্থান অর্জন করে। বিজয়ী প্রকল্পগুলোকে স্বীকৃতি সনদ ও সিডমানি প্রদান করা হয়।
সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির chairperson জাহরাত আদিব চৌধুরী। এ ছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশ নেন একশনএইড ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সোসাইটির বোর্ড চেয়ার ইব্রাহিম খলিল আল জায়াদ। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বুয়েটের অধ্যাপক এমএএ শওকত চৌধুরী ও একশনএইড বাংলাদেশের ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ এবং সমাপনী বক্তব্য রাখেন কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির।