সরকারি আয় ও ব্যয়ের বড় ব্যবধান মেটাতে গিয়ে দিন দিন ঋণের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদিও রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে ঋণ কমানোর পরিকল্পনা দীর্ঘদিনের, কিন্তু বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে তা কাঙ্ক্ষিত গতিতে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। ফলে বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় অর্থবছরের শুরু থেকেই সরকারকে বড় অঙ্কের ঋণের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। তবে এবার ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ কমাতে সরকার বিকল্প অর্থায়নের দিকে নজর দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে সরকার মোট ১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে বিদেশি উৎস থেকে এসেছে ৫৮ হাজার কোটি টাকা। আর অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা ও সঞ্চয়পত্র থেকে নেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি ঋণ নিতে হয়েছে সরকারকে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যাংক থেকে অধিক ঋণের ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে, যা অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক। এই উদ্বেগ থেকেই বিকল্প অর্থায়নের পথ খুঁজছে সরকার। এর অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে সার্বভৌম বন্ড ইস্যু এবং অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি সুকুক বা ইসলামী বন্ড ছাড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বাজেট সহায়তা হিসেবে বহুপক্ষীয় সংস্থার তহবিল, সবুজ বন্ড ও নীল বন্ডের মতো উদ্ভাবনী পদ্ধতির দিকেও মনোযোগী হচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর বিষয়ে সুপারিশ ও কৌশল নির্ধারণের জন্য গত জুলাই মাসে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গণিকে প্রধান করে গঠিত এ কমিটিতে অর্থ বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিএসইসি’র প্রতিনিধিরা রয়েছেন। কমিটি ইতিমধ্যে তাদের পর্যালোচনামূলক প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, প্রথম ধাপে চীন, জাপান, হংকং এবং যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে বন্ড ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যে ৫০ কোটি থেকে ১০০ কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই উদ্যোগে সম্মতি দিয়েছেন এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।
বন্ডের ধরন সম্পর্কে সংশ্লিষ্টরা জানান, চীনের বাজারে ‘পান্ডা বন্ড’, জাপানের বাজারে ‘সামুরাই বন্ড’, হংকংয়ে ‘ডিমসাম বন্ড’ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ডলারভিত্তিক বন্ড ছাড়ার প্রস্তুতি চলছে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান জেপি মরগান ও এইচএসবিসির পরামর্শ নেওয়া হবে। তবে গত ২০ জুনের একটি বৈঠকে অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার উল্লেখ করেছেন যে, আগে বাংলাদেশের ঋণমান উন্নয়ন প্রয়োজন। এছাড়া অতীতে ঝুঁকির কথা ভেবে এই পদ্ধতি থেকে দূরে থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এটি নতুন করে যাচাই করা হচ্ছে।
অবকাঠামো উন্নয়নে বড় পরিসরে সুকুক ইস্যুর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকার সুকুক ইস্যু হয়েছে, যা বড় প্রকল্প ও গ্রামীণ উন্নয়নে ব্যবহৃত হয়েছে। বর্তমানে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বিক্রয়যোগ্য সুকুক ইস্যুর প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
তবে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগগুলো কতটা ঝুঁকিমুক্ত, তা নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেনের মতে, আন্তর্জাতিক বন্ডের সুদ এবং ঝুঁকি প্রিমিয়াম দুটিই বেশি। তিনি শ্রীলঙ্কার উদাহরণ টেনে বলেন, ভুল সময়ে অধিক বন্ড ইস্যু ও তার দায় পরিশোধের চাপ দেশটির অর্থনীতিকে সংকটে ফেলেছিল। বিশ্বব্যাংক বা এডিবি’র ঋণের তুলনায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সংগৃহীত অর্থ অনেক ব্যয়বহুল হয়।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ঋণমান বা ক্রেডিট রেটিং এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। ২০২৪ সালে মুডিস ও এসঅ্যান্ডপি বাংলাদেশের ঋণমান কমিয়ে দিয়েছে। আইএমএফ-এর মূল্যায়নেও বাংলাদেশের অবস্থান ‘নিম্ন ঝুঁকি’ থেকে ‘মধ্যম ঝুঁকি’তে নেমেছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রায় উচ্চ সুদের বন্ড অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এদিকে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক অধ্যাপক এ কে এনামুল হক বলেন, সার্বভৌম বন্ডের সফলতা নির্ভর করে এর কাঠামোর ওপর। ইন্দোনেশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার আর্থিক সংকটের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বাজেট সহায়তার বিষয়টিও সরকারের পরিকল্পনায় আছে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক ১৫০ কোটি ডলারের সহায়তা অনুমোদন করেছে, যার মধ্যে ৭৮৫ মিলিয়ন ডলার বিভিন্ন প্রকল্পের অব্যবহৃত ঋণ থেকে সরিয়ে সমন্বয় করা হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকেও ১৪০ কোটি ডলারের সহায়তা চুক্তি হয়েছে, যা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যয় হবে। পাশাপাশি এডিবির ৫ বিলিয়ন ডলারের ‘ইন্টিগ্রেটেড গ্রোথ নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ প্রতিবছর অতিরিক্ত ১০০ কোটি ডলারের প্রবাহ নিশ্চিত করছে।
পরিশেষে, অর্থনীতিবিদরা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, এসব বিকল্প পথ অবলম্বন করলেও দিনশেষে সবই ঋণ। রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর মূল লক্ষ্য থেকে যেন সরকারের মনোযোগ সরে না যায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, অপচয়মূলক ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই হবে টেকসই অর্থনীতির প্রকৃত পথ। চাকরির আরও তথ্য: এর প্রধান বিনিয়োগকারী সাধারণত চীনের নাগরিকরা হলেও কিছু ক্ষেত্রে অন্য দেশের বিনিয়োগকারীরাও এতে অংশ নিতে পারেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: খায়েরুজ্জামান মজুমদারের সভাপতিত্বে অর্থ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত উচ্চ পর্যায়ের সভায় এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অনুমোদন পাওয়া গেলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জাপানি মুদ্রা ইয়েনে ইস্যু করা বৈদেশিক বন্ডকে সামুরাই বন্ড বলা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচনা করা যেতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সভায় অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা জানান, ২০২০ সাল থেকে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি সুকুক ইস্যু করছে।