বিশ্বের যে প্রান্তেই বাঙালিরা পাড়ি জমাক না কেন, প্রথম প্রজন্মের অভিবাসী বা ইমিগ্র্যান্ট হিসেবে নিজেদের অস্তিত্বের সংগ্রাম তাদের আজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। অচেনা জল-হাওয়ায় নতুন এক যাপনপদ্ধতি নিজেদের মাঝে আত্তীকরণ করার পর শুরু হয় এক নীরব দ্বান্দ্বিক সংগ্রাম। নিজের শিকড় আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা এবং সেই সঙ্গে নতুন দেশের নাগরিকতার মাঝে যোগসূত্র স্থাপন করা মোটেও সহজ নয়। এই বাস্তবতায় প্রবাসীদের হৃদয়ের এক বিশাল অংশ জুড়ে সবসময়ই বিরাজ করে নিজের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। তবে প্রবাসের নিরাপদ জীবনে থেকেও জন্মভূমির নানা নেতিবাচক খবর ও অনিশ্চয়তা প্রবাসীদের প্রতিনিয়ত ভাবিয়ে তোলে। দেশের বিদ্যমান শাসনব্যবস্থা ও সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রবাসীদের ক্ষোভ ও হতাশা যেমন আছে, তেমনই আছে পরিবর্তনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের প্রশ্ন—এই নেতিবাচক অবস্থার কি আসলেই কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন হওয়া সম্ভব? মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আজ দেশের লাখো প্রবাসীর একটাই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে এই সুশাসনের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার পেছনে যে বিষয়গুলো সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো লাগামহীন দুর্নীতি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্বখ্যাত সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সর্বশেষ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বৈশ্বিক পর্যায়ে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ১৩তম। এই পরিসংখ্যানটি বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজ পতাকাকে যেমন কালিমালিপ্ত করে, তেমনই বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের আত্মমর্যাদাকে দারুণভাবে আঘাত করে। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীনতার এত বছর পরও এই ধরনের সূচকে বাংলাদেশের তলানিতে থাকা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। প্রবাসীদের রক্ত পানি করা রেমিট্যান্স যেখানে দেশের অর্থনীতির মূল চাকা সচল রাখছে, সেখানে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সুশাসনের অভাব ও দুর্নীতির এই চিত্র অত্যন্ত পীড়াদায়ক। এই দুষ্টচক্র থেকে দেশকে বের করে আনা না গেলে কোনো স্থায়ী জাতীয় উন্নয়নই দীর্ঘমেয়াদে সুফল বয়ে আনবে না।
অবশ্য সংকটের মধ্যেও দেশের অর্থনীতি নিয়ে কিছু আশার আলো ও সম্ভাবনার পূর্বাভাস দেখা যাচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং অভ্যন্তরীণ নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জনের ক্ষণ ঘনিয়ে আসছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, সামগ্রিকভাবে ২০২৬ সালের নভেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে স্থায়ীভাবে শামিল হতে যাচ্ছে। এই রূপান্তরটি দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও বিশ্ব বাণিজ্য ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যদিও স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা সংকুচিত হওয়াসহ নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে বাংলাদেশকে, তবুও একে একটি বড় অর্জন হিসেবেই দেখছেন বিশ্ব অর্থনীতিবিদরা। এই ঐতিহাসিক রূপান্তর সফলভাবে সম্পন্ন করতে হলে এখন থেকেই কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিশেষ জোর দেওয়া প্রয়োজন।
চলতি ও আগামী অর্থবছরের অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির ধারা এখনো একটি পরিমিত মাত্রার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪% থেকে ৪.৭% হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও অভ্যন্তরীণ আর্থিক খাতের সংস্কারের ওপর ভিত্তি করেই এই প্রবৃদ্ধির হিসাব কষা হয়েছে। প্রবৃদ্ধির এই হারকে আরও টেকসই করতে হলে অবশ্যই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরা আবশ্যক। প্রথম প্রজন্মের প্রবাসীরা সবসময়ই স্বপ্ন দেখেন যে, তাদের প্রেরিত অর্থ যেন দেশের মানুষের প্রকৃত ভাগ্যোন্নয়নে কাজে লাগে। বাংলাদেশ যদি সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে এবং সঠিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে, তবে বিশ্বের বুকে একটি মর্যাদাবান ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো মোটেও অসম্ভব নয়। সেই প্রত্যাশাই আজ প্রতিটি প্রবাসী হৃদয়ে ধারণ করে চলেছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রতিটা দেশের কালচারেই প্রথম জেনারেশন ইমিগ্র্যান্ট বলে একটা কথা বা নাম প্রচলিত আছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিদেশের পটভূমিতে ‘প্রথম’ আগমনের লেবেলটি যারা পায়, তাদের সেই নতুন অধ্যায়ের শুরু থেকেই অনেক ঝড়ঝাপটার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। চাকরির আরও তথ্য: পড়াশোনা, চাকরি, বিয়ে কিংবা পারিবারিক ইমিগ্রেশনের মাধ্যমে বাঙালিরা সাধারণত বিদেশে পাড়ি জমায় এবং সম্পূর্ণ নতুন একটি দেশে এসে জীবনটাকে নতুনভাবে গড়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাদের ভাবনায় যে জিনিসটি প্রাধান্য পায়, সেটি হলো নতুন জায়গায় প্রতিষ্ঠা লাভ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অনেক চেষ্টা, অনেক ধৈর্য, অনেক পরীক্ষা, অনেক পরিশ্রমের বোঝা তাদের বহন করতে হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ ছেড়ে যোজন যোজন মাইল দূরের প্রবাসজীবনে দ্বিতীয় নিবাস গড়ে তুলতে বহু রকম চড়াই-উতরাই পার হতে হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নতুন জীবনের প্রথম দিনগুলো কারও জন্য হয় সহজ, আবার কারও জন্য হয় কঠিন।