সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে সুপারিশ পাওয়ার পরও নিয়োগপত্র না পাওয়ায় দেশজুড়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। ভেরিফিকেশন বা প্রশাসনিক যাচাই-বাছাই শেষে নিয়োগপত্রের তালিকায় নাম না থাকায় অনেক প্রার্থী বিপাকে পড়েছেন। প্রার্থীদের প্ল্যাটফর্মের দাবি অনুযায়ী, নিয়োগ থেকে বাদ পড়া প্রার্থীর সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। অন্য একটি হিসাব বলছে, এই সংখ্যা ২ হাজার ২০০ ছাড়িয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। একই সঙ্গে ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত অথচ নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ এবং পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এমন পরিস্থিতির কারণ জনসমক্ষে ব্যাখ্যার দাবি জানিয়েছেন তারা।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সরকারি যেকোনো নিয়োগের ক্ষেত্রে ভেরিফিকেশন বা ভেটিং একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। মন্ত্রণালয় আরও জানায়, নিয়োগপত্র নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। আগামী ১ অক্টোবর পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কেউ নিয়োগপত্র না পেলে পরবর্তীতে যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা সাপেক্ষে দ্রুততম সময়ে পর্যায়ক্রমে নিয়োগপত্র প্রদান করা হবে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মূলত চারটি নির্দিষ্ট কারণে প্রার্থীদের নাম বাদ পড়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার নেতিবাচক প্রতিবেদন, ডোপ টেস্টে অযোগ্য হওয়া, স্বাস্থ্য সনদের অনুপস্থিতি এবং শিক্ষা সনদের তথ্যে গরমিল। এর মধ্যে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন নেতিবাচক হওয়া প্রার্থীর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি বলে জানা গেছে।
বাদ পড়া প্রার্থীদের প্ল্যাটফর্মটি নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে। তাদের দাবি, ভেরিফিকেশনে বাদ পড়া প্রত্যেক প্রার্থীর নথি নিরপেক্ষভাবে পুনর্যাচাই করতে হবে। এ ছাড়া, কোনো তথ্যের অমিল থাকলে প্রার্থীর আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং প্রশাসনিক আপিলের ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়েছে। এছাড়া, কোনো দাপ্তরিক ভুল বা গাফিলতির কারণে কেউ বাদ পড়ে থাকলে তা সংশোধন করে তাদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে বিভিন্ন জেলায় নিয়োগপত্র বিতরণ শুরু হলে এই জটিলতা সামনে আসে। প্রার্থীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চাঁদপুরে ২৭ জন, মুন্সীগঞ্জে ৩ জন, শরীয়তপুরে ৬ জন, সাতক্ষীরায় ২ জন, ঝালকাঠিতে ১২ জন, লক্ষ্মীপুরে ২ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৪ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৭ জন, পাবনায় ৩৫ জন, রাজবাড়ীতে ১৫ জন, ফরিদপুরে ১২ জন, বগুড়ায় ৪৮ জন, সুনামগঞ্জে ১২০ জন, কুষ্টিয়ায় ১৬ জন এবং মানিকগঞ্জে ২২ জন নিয়োগপত্র পাননি। বিভিন্ন জেলায় এমন অন্তত ৩৫১ জন প্রার্থীর তথ্য পাওয়া গেছে, যদিও এটি কোনো পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়। এসব জেলার তথ্য যোগ করলে সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৫১। সুনামগঞ্জে ৬১৭ জনের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্নের জন্য সুপারিশ পাঠানো হলেও সর্বশেষ যাচাইয়ে ১২০ জনকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
নিয়োগ না পাওয়ায় খুলনা, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও যশোরের প্রার্থীরা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। খুলনায় ২৬৫ জন কাগজপত্র জমা দিলেও এর মধ্যে ১৯৬ জন নিয়োগপত্র পেয়েছেন, আর ৬৯ জন পাননি। মৌলভীবাজারে ৩৪৭ জন সুপারিশপ্রাপ্তের মধ্যে ৬৭ জন এবং যশোরে ২৯০ জনের মধ্যে ১০৬ জন নিয়োগপত্র থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। নাটোরে প্রতিবন্ধী প্রার্থীসহ মোট ৩৪ জন চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েও নিয়োগপত্র পাননি। খুলনায় ২৭৫ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হলেও ২৬৫ জন কাগজপত্র জমা দেন।
উল্লেখ্য, গত ৯ জানুয়ারি সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫ এর লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ৬৯ হাজার ২৬৫ জন উত্তীর্ণ হওয়ার পর মৌখিক পরীক্ষার আয়োজন করা হয়। এরপর ৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করে ১৪ হাজার ৩৮৪ জনকে সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের জন্য নির্বাচন করা হয়। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫-এর লিখিত পরীক্ষা গত ৯ জানুয়ারি দেশের ৬১ জেলায় অনুষ্ঠিত হয়।
বর্তমানে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিতদের ১ অক্টোবর সংশ্লিষ্ট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে যোগদানের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর ৪ অক্টোবর পদায়নের আদেশ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের। মন্ত্রণালয় বলছে, ১ অক্টোবর পর্যন্ত কোনো উত্তীর্ণ প্রার্থী নিয়োগপত্র না পেলে তাঁর বিষয়টি পরবর্তী সময়ে যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। তবে চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পর কেন অনেকের নাম বাদ পড়ল এবং ভেরিফিকেশনে তাদের বিরুদ্ধে কী নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে—সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।