বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের মাধ্যমে টেকসই অর্থনীতি রূপান্তরের ডাক জাপান সফরে চার সমঝোতা স্মারক ও দুই অনুদান চুক্তি সই জুলাইয়ের চেতনা বাঁচিয়ে রাখলে চাঁদাবাজি সম্ভব নয়: ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনতেই হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন দেশে ডেঙ্গুতে একদিনে ৯ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি প্রায় ২ হাজার জিম্বাবুয়েকে হারিয়ে টি-টোয়েন্টি সিরিজে এগিয়ে আফগানিস্তান ১৫ নভেম্বর থেকে দ্বিতীয় ‘গ্লোবাল সোর্সিং এক্সপো’ আয়োজন করবে ইপিবি নারায়ণগঞ্জে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে বাবা ও ছেলে নিহত বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম কমল: প্রভাব ফেলছে জ্বালানি তেলের উত্তাপ ঢামেকে অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট: ভোগান্তিতে রোগী ও স্বজন

কিশোর গ্যাং ও অপরাধ দমনে বড় অভিযানের ভাবনা

Reporter Name / ৪৯ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সাম্প্রতিক অবনতি, সন্ত্রাসী তৎপরতা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার চিন্তা করছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। বিশেষ করে কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি এবং মাদক সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য রুখতে একটি বড় ধরনের বিশেষ অভিযান পরিচালনার সম্ভাবনা নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে। বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহেই এ বিষয়ে পরবর্তী করণীয় ও রূপরেখা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হতে পারে। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, গত কয়েক দিনে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক একাধিক বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সম্প্রতি পরপর কয়েকটি ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ ও নিরাপত্তার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আশপাশের কয়েকটি বাড়ি ও স্থাপনাতেও হামলা হয়।

প্রস্তাবিত এই অভিযানটি ঠিক কী ধরনের হবে কিংবা এর কোনো নির্দিষ্ট নাম দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে এখনো মতভেদ রয়েছে। তবে সরকারি নীতিনির্ধারকদের সবুজ সংকেত পাওয়া গেলে দেশব্যাপী এই কার্যক্রম শুরু হতে পারে। ২০০২ সালে বিএনপি সরকারের সময় পরিচালিত ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’-এর অভিজ্ঞতা ও কাঠামোকে উদাহরণ হিসেবে সামনে রেখে এই ভাবনার আলোচনা চলছে। ওই সময়ে ৮৪ দিনব্যাপী যৌথ বাহিনীর অভিযানে প্রায় ১২ হাজার গ্রেপ্তারের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছিল, যা এখন নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় রয়েছে।

সাম্প্রতিক বেশ কিছু ঘটনা জনমনে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে কুমিল্লার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপ্রতিম নিখোঁজের পর গত ১৮ সেপ্টেম্বর লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে উদ্ধার হওয়া তার নিথর দেহ অন্যতম। এ ঘটনার পেছনে কিশোর গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া রাজধানীতে গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পরবর্তী ৪৭ ঘণ্টায় মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও আদাবরের মতো এলাকায় হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও দখলের চেষ্টার মতো ঘটনার প্রেক্ষিতে নীতিনির্ধারকরা অপরাধীদের কঠোর বার্তা দিতে চাইছেন। পরদিন কুমিল্লা সদর দক্ষিণের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এর রেশ কাটতে না কাটতেই ঢাকায় বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে পরবর্তী ৪৭ ঘণ্টায় পৃথক চারটি স্থানে হামলা, দখলচেষ্টা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। শনিবার রাতে ইসিবি চত্বরে নিউগিনি প্রপার্টিজে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, গুলি, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রাজধানী ছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলায় ২২৭টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে, যেখানে মোট সদস্য সংখ্যা ২,৫৫০ জন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরে ৯৮টি, সিলেটে ১৫টি, রাজশাহী ও গাজীপুর মহানগরে ১৩টি করে এবং খুলনা মহানগরে ৭টি গ্যাং রয়েছে। জেলা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ২৫টি গ্যাং নোয়াখালীতে সক্রিয়। অন্যদিকে, খোদ রাজধানীতেই ১৫৯টি গ্যাংয়ের ১,৮১২ জন সদস্য সক্রিয় রয়েছে; যার মধ্যে কেবল মোহাম্মদপুরেই ২৭টি গ্যাং ও ৩৫০ জন সদস্যের উপস্থিতি রয়েছে। পল্লবী থানা এলাকায় রয়েছে ১৬টি গ্যাং ও ১৬০ জন সদস্য। মিরপুর-১ নম্বরে গরিব মানুষের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে দুই থেকে আড়াইশ মানুষের একটি দল হামলা চালিয়ে স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়।

অপরাধ দমনে নতুন কৌশলের পাশাপাশি বিদ্যমান তালিকাও হালনাগাদ করা হচ্ছে। রাজধানীতে চাঁদাবাজি ও জমি দখল সংক্রান্ত পুলিশের তালিকায় ১,৫৩০ জনের নাম রয়েছে। এছাড়া মাদক নেটওয়ার্কের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ৪০৬ জন ব্যবসায়ী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে সিআইডির মানি লন্ডারিং ইউনিট একযোগে অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করেছে।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও জানমাল রক্ষায় যৌথ অভিযানের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও এ ক্ষেত্রে মানবাধিকার রক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন জরুরি। তার মতে, সাম্প্রতিক মব সন্ত্রাস ও অপরাধমূলক তৎপরতা দেশকে এক প্রকার নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

পুলিশ সদরদপ্তরের এআইজি শাহাদাত হোসাইন জানান, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজ ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে চলচ্চিত্র ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে গ্যাং সহিংসতাকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করায় কিশোররা অপরাধে জড়াতে উৎসাহিত হচ্ছে। তিনি সমাজ ও পরিবারের সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

অতীতে বিভিন্ন সরকার বিভিন্ন সময়ে অপরাধ দমনে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে। এর মধ্যে ২০১৮ সালের মাদক বিরোধী বিশেষ অভিযান এবং ২০১৯ সালের ক্যাসিনো ও দুর্নীতি বিরোধী ‘শুদ্ধি অভিযান’ উল্লেখযোগ্য। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল এবং লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে পুরস্কারের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছিল।

তবে নতুন অভিযানের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের একাংশের শঙ্কা হলো, কোনো নির্দিষ্ট নাম দিয়ে অভিযান চালালে এবং তা প্রত্যাশিত সাফল্য না পেলে বা সমালোচনার মুখে পড়লে সেটি নেতিবাচক প্রচারণার কারণ হতে পারে। তাই অভিযানের রূপরেখা চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে প্রতিটি দিক সতর্কতার সঙ্গে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সম্প্রতি তাদের বিবৃতিতে জানিয়েছে, বর্তমানের অস্থিরতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতিরই ধারাবাহিকতা। তাই কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ না নিলে চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের মতো অপরাধগুলো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে সংস্থাটি সতর্ক করেছে।

সর্বশেষ, কুমিল্লায় অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর কিশোর গ্যাং সদস্যদের গ্রেপ্তারে পুলিশের তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে এবং সারাদেশের বিভিন্ন জেলায় বিশেষ নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন। তবে বড় অভিযানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও সময়সূচি নির্ধারণের ভার আপাতত নীতিনির্ধারকদের হাতেই রয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা