বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা আবারও সংশোধন করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত তাদের সর্বশেষ ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক’ হালনাগাদ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশ হতে পারে। এর আগে জুলাই মাসে সংস্থাটি এই প্রবৃদ্ধির হার ৪ দশমিক ৫ শতাংশ থাকবে বলে অনুমান করেছিল। একইসাথে, ওই অর্থবছরে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে, যা আগের পূর্বাভাসে ছিল ৮ দশমিক ৮ শতাংশ।
প্রতিবেদনে অর্থনীতির বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়েছে, যার মধ্যে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা প্রধান। উচ্চ সুদহারের কারণে ব্যাংকগুলো এখন বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার চেয়ে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এতে শিল্প সম্প্রসারণ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ সীমিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক আস্থার অভাব বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি নিয়ে সংস্থাটির বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই হার ৩ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাব এবং সরবরাহব্যবস্থায় সীমাবদ্ধতা শিল্প উৎপাদন ব্যাহত করছে। এছাড়া নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতাও গতিরোধক হিসেবে কাজ করছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় মুদ্রানীতির কিছুটা নমনীয়তা থাকলেও ব্যাংক খাতের অভ্যন্তরীণ সংকট কাটানো ছাড়া দ্রুত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের ভোগও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যক্তিগত ভোগ অব্যাহত থাকবে, তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে সংকুচিত করছে। প্রবাসী আয় কিছুটা স্বস্তি দিলেও তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা কঠিন হবে।
কৃষি খাতের ওপর এল নিনোর প্রভাব নিয়েও সতর্ক করেছে এডিবি। আবহাওয়া পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং সারের সীমাবদ্ধতা কৃষি উৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণের খরচ বাড়বে, যা সামগ্রিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দামকে উসকে দিতে পারে। তবে পরিষেবা খাত কিছুটা ভালো অবস্থানে রয়েছে। আগামী অর্থবছরে এ খাতে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে। মূলত অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও চাহিদা বৃদ্ধির সুবাদে এই খাত প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখতে সক্ষম হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির দ্বৈত ঝুঁকি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এডিবির তথ্যমতে, প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ব্যাংক খাতের সংস্কার করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।