সংবিধানের মৌলিক কোনো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী গণভোটের আয়োজন করা হবে বলে জানিয়েছে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। রবিবার জাতীয় সংসদের ক্যাবিনেট কক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এই বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়। সভায় দেশের শীর্ষ স্থানীয় প্রায় ৫০ জন সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিক অংশ নেন। দুই ঘণ্টাব্যাপী এই সভায় সংবিধান সংশোধনের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। একটা হচ্ছে সাংবিধানিক গণভোট, আরেকটা হচ্ছে আইনের গণভোট।
বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ জানান, আগামী ২০২৭ সালের জানুয়ারি মাসে সংসদ অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব উত্থাপন ও পাস করার লক্ষ্য রয়েছে তাদের। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য আনার বিষয়ে কাজ করা হচ্ছে। অতীতে প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকা একচ্ছত্র ক্ষমতা রাষ্ট্র ও জাতির জন্য কল্যাণকর ছিল না বলে মত দেন তিনি। এছাড়াও, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনরায় সংবিধানে ফিরিয়ে আনার প্রস্তাবও কমিটিতে গুরুত্ব পেয়েছে।
গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের পক্ষে দৈনিক দেশ রূপান্তরের সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি জানান, সংবিধান সংশোধনের পুরো প্রক্রিয়াটি যেন জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, সেই দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিকরা। তিনি বলেন, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী মৌলিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোটের পথ খোলা রয়েছে। এছাড়া, ভবিষ্যতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের সুযোগ বন্ধে সংবিধানে অত্যন্ত কঠোর বিধান যুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। সরকারি নিয়োগে সব ধরনের বৈষম্য দূর করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়েও সভায় জোর দেওয়া হয়েছে। কোন বিষয়ে আইন প্রণীত হলো, সেই হিসেবে জনগণের গণভোটের আহ্বান করা যায়। এই আইন সভায় গ্রহণ করতে হবে, এরপরে সেটা কনস্টিটিউশনে প্রপারলি আসবে।
সাংবিধানিক ও আইনি গণভোটের ব্যাখ্যা দিয়ে সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গণভোটের যে বিধান ছিল, তা পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল করা হয়েছিল। তবে ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে ওই অনুচ্ছেদটি পুনর্বহালের নির্দেশনা এসেছে। তিনি জানান, সংবিধানে নতুন কিছু অনুচ্ছেদ যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যাতে নির্দিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিধান পরিবর্তন করতে হলে অবশ্যই গণভোটের প্রয়োজন হয়। আওয়ামী লীগের সময় পঞ্চদশ সংশোধনীতে সেটা উড়িয়ে দিয়েছে। বাট, এটা ৫ই আগস্টের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের পরে সুপ্রিম কোর্টে একটা ভার্ডিক্ট হয়েছে ফিফটিনথ অ্যামেন্ডমেন্ট যেটা রিপিল করার জন্য চ্যালেঞ্জ করে যে রিটটা হয়েছে সেখানে জাজমেন্ট এসেছে যে আর্টিকেল ১৪২-এর যে গণভোট সেটা পুনর্বহাল করা হলো। আমরা যদি সংবিধানে এমন কিছু পরিবর্তন আনি, তাহলে সেটা রেফারেন্ডামে যেতে হবে, জনগণের গণভোট হতে হবে।
কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্যদের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, বিরোধী দলকে বারবার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং এখনো জানানো হচ্ছে। তারা কমিটিতে যোগ দিলে সবার মতামতের ভিত্তিতে আরও গ্রহণযোগ্য রিপোর্ট তৈরি করা সম্ভব হতো। তবে তারা কমিটিতে না এলেও, সংসদে যখন প্রস্তাবটি উঠবে, তখন তারা সহযোগিতা করবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত ‘হ্যাঁ/না’ ভোটের বিষয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে কমিটি জানায়, সেটি মূলত প্রক্রিয়াগত ছিল। তবে সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক গণভোটের বিষয়টিকে কমিটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। সভায় কমিটির সদস্য হিসেবে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, জয়নুল আবেদীন, মোঃ জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমীন, সাকিলা ফারজানা এবং মো. মাহমুদুল হক রুবেল উপস্থিত ছিলেন।