পেশা বা আয়ের উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে বর্তমানে অনেকেরই অসংলগ্ন ও ভয়ের জবাব মেলে—‘অমুক ভাই-এর সঙ্গে আছি’। এই ‘ভাই’ শব্দটি এখন স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতা ও ত্রাসের প্রতিশব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাস্তান বা রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে গড়ে তোলা এই চাঁদাবাজ চক্র শহর থেকে বন্দর, এমনকি গ্রামগঞ্জেও একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে। এদের ভয়ে অনেক ব্যবসায়ী এলাকাছাড়া হয়েছেন কিংবা নতুন বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকছেন। চাঁদাবাজির এই মহামারি এতটাই প্রকট যে, ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রেও ম্যানেজারদের নিয়ন্ত্রণ করছে এই সিন্ডিকেট। লোন প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপেই তাদের নজরদারি থাকে।
চাঁদাবাজির এই সংস্কৃতি রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও প্রশাসনিক সহায়তায় টিকে থাকে। ফুটপাথের হকার থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজ, এমনকি বিভিন্ন পরিবহনেও নির্দিষ্ট হারে চাঁদা দিতে বাধ্য করা হয়। এসব ক্ষেত্রে প্রায়ই অস্ত্র ও মাদকের ব্যবহার দেখা যায়, যা কিশোর গ্যাংয়ের মতো অপরাধী গোষ্ঠীকে উৎসাহিত করছে। দখলবাজি ও ভাগাভাগির এই প্রতিযোগিতায় এখন খোদ আইনপ্রণেতাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠছে। শিল্পাঞ্চলেও চাঁদাবাজির তীব্রতা কম নয়; বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এই পরিস্থিতির চাপে অস্থির। অনেক সময় ব্যবসায়ীদের নিম্নমানের মালামাল কিনতে বাধ্য করা হয়, যার ব্যতিক্রম হলে নেমে আসে হামলা ও নির্যাতন।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিশৃঙ্খলার নেপথ্যে রয়েছে প্রশাসনিক চরম দুর্বলতা। স্থানীয় প্রশাসনের কর্তারা অনেক সময় ‘ভাই’দের নিয়ন্ত্রণে থাকেন। সহযোগিতা না করলে বদলি বা ওএসডি হওয়ার ভয় তো থাকেই। এছাড়া টেন্ডার বাণিজ্য এখন পুরো সিন্ডিকেটের দখলে। হাটে-মাঠে, এমনকি বালুমহাল ইজারার মতো সরকারি সম্পত্তিও এই চক্রের বাইরে নয়। শোনা যায়, অনেক সময় প্রভাবশালী নেতাদের পকেটেও চাঁদার ভাগ সময়মতো পৌঁছে যায়, ফলে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এমনকি কবরের মাটি পেতেও অনেক ক্ষেত্রে এই ‘ভাই’দের শরণাপন্ন হতে হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু কর্মকর্তার অসহায়ত্বও এই পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ‘আপনারা সবসময় আমাদের দোষারোপ করেন যে আমরা দেখেও দেখি না। কিন্তু প্রমোশন ও পোস্টিংয়ের বাণিজ্যের কথা তো অজানা নয়। একজন কর্মকর্তা যখন মোটা অংকের টাকা বিনিয়োগ করে দায়িত্ব পান, তখন সেই পুঁজি তুলতে তাকে এই চাঁদাবাজদের সঙ্গে আপস করতেই হয়।’ এই নিয়োগ ও পোস্টিংয়ের চক্রটিই মূলত অপরাধীদের সুরক্ষা দিচ্ছে।
বর্তমানে অপরাধের ধরনেও এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। কমিশন বাণিজ্যের অর্থ এখন বিদেশি ব্যাংকের পরিবর্তে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেন হচ্ছে, যাতে ঝুঁকি কম থাকে। একই সঙ্গে দেশের বাইরে বসেও বেশ কিছু চাঁদাবাজ গ্রুপ দেশীয় নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও চাঁদাবাজির এই নেটওয়ার্কের কাঠামো কেবল নতুন রূপ ধারণ করে, কিন্তু সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ একই থেকে যায়। ক্রমবর্ধমান ছিনতাই, রাহাজানি ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার কারণে জনগণের আস্থাহীনতা ক্রমশ প্রকট হচ্ছে।