যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন বা সিডিসির মতে, বিশ্বের প্রায় ৪০০ কোটি মানুষ বর্তমানে ডেঙ্গু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। বাংলাদেশে ২০০০ সালে রাজধানী ঢাকায় বড় আকারে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব প্রথম নজরে আসে। সেই সময় থেকেই বাংলাদেশ ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই করছে, তবে বিগত কয়েক বছর ধরে এর প্রকোপ উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। চলতি বছর বর্ষা শুরুর আগেই ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টির ধরন পরিবর্তন এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণকে এর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই শতাব্দীর শুরুতে ২০০০ সালে ডেঙ্গুজ্বর বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা সবার নজরে আসে।
ডেঙ্গুর কোনো সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ বা চিকিৎসা না থাকায় টিকার প্রয়োজনীয়তা এখন সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে। অনেকের প্রশ্ন, করোনা মহামারির টিকা দ্রুত এলেও ডেঙ্গুর টিকা কেন এখনো সহজলভ্য নয়? এর অন্যতম কারণ ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ভিন্ন সেরোটাইপ (ডেন ১, ২, ৩ ও ৪)। এমন একটি টিকা তৈরি করা চ্যালেঞ্জিং, যা চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই সমান কার্যকর হবে। ঢাকা থেকে সৌদিগামী ৮৯ ফ্লাইট স্থগিত, দুর্ভোগে ১৪ হাজারের বেশি যাত্রী। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে টিকা বা ভ্যাকসিন কতটা কার্যকরী। টঙ্গীতে ওষুধ কারখানার আগুন নিয়ন্ত্রণে। প্রায় প্রতি বছরেই কমবেশি ডেঙ্গুজ্বর হয়ে থাকে।
বাজারে বর্তমানে দুটি উল্লেখযোগ্য টিকার নাম শোনা যায়: ‘ডেংভ্যাক্সিয়া’ ও ‘কিউডেঙ্গা’। ফ্রান্সের একটি কোম্পানির তৈরি ডেংভ্যাক্সিয়া টিকার প্রয়োগে চারটি সেরোটাইপের অ্যান্টিবডি তৈরি হলেও সেল মেডিয়েটেড ইমিউনিটি তৈরি হয় না। ফলে কিছু ক্ষেত্রে এটি ‘অ্যান্টিবডি ডিপেন্ডেন্ট এনহান্সমেন্ট’ নামক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে, যা ডেঙ্গুকে আরও মারাত্মক করে তুলতে পারে। এটি ৯ থেকে ১৬ বছর বয়সীদের জন্য অনুমোদিত এবং যারা আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে শুধুমাত্র তাদেরই দেওয়া হয়। ডেঙ্গুতে আরও ৫ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ১৯২০। মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনা আর অনেক মৃত্যু সাধারণ জনগণের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
অন্যদিকে, জাপানের উদ্ভাবিত ‘কিউডেঙ্গা’ টিকাটি বর্তমানে বেশি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এই টিকা নিতে আগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার প্রয়োজন নেই এবং এটি ৪ থেকে ৬০ বছর বয়সীরা গ্রহণ করতে পারেন। এটি চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই কার্যকর এবং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও তুলনামূলকভাবে কম। বর্তমানে প্রায় ২০টি দেশে এই টিকা ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কিউডেঙ্গাকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং এটি ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর হাসপাতালে ভর্তির ঝুঁকি ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়।
ভারতের ডক্টর রেড্ডিস ল্যাবরেটরি কিউডেঙ্গা বাজারজাত করার জন্য চুক্তি করেছে এবং দেশটির ঔষধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা চলতি বছরের জুলাই মাসে এর অনুমোদন দিয়েছে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার এক বছর পর নিশ্চিত সংক্রমণ রোধে এটি ৮০.২ শতাংশ এবং ১৮ মাস পর হাসপাতালে ভর্তির ক্ষেত্রে ৯০.৪ শতাংশ কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
আইসিডিডিআরবি’র গবেষকরা ২০২৩ সালে ‘টিভি০০৫’ নামে আরেকটি টেট্রাভালেন টিকার দ্বিতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল চালিয়েছেন, যা সফলতা দেখিয়েছে। এই টিকার সুবিধা হলো একটি ডোজই চার ধরনের সেরোটাইপের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয় এবং সব বয়সের মানুষের জন্য এটি উপযোগী হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন পর্যন্ত টিকার কার্যকারিতা নিয়ে আরও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। যতদিন কার্যকর টিকা পুরোপুরি সহজলভ্য না হয়, ততদিন এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ ও সচেতনতাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রধান উপায়। ডেঙ্গু এখন আর শুধু শহরকেন্দ্রিক সমস্যা নয়, বরং গ্রামগঞ্জেও ছড়িয়ে পড়ছে। তাই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে একটি টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।