বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের মাধ্যমে টেকসই অর্থনীতি রূপান্তরের ডাক জাপান সফরে চার সমঝোতা স্মারক ও দুই অনুদান চুক্তি সই জুলাইয়ের চেতনা বাঁচিয়ে রাখলে চাঁদাবাজি সম্ভব নয়: ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনতেই হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন দেশে ডেঙ্গুতে একদিনে ৯ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি প্রায় ২ হাজার জিম্বাবুয়েকে হারিয়ে টি-টোয়েন্টি সিরিজে এগিয়ে আফগানিস্তান ১৫ নভেম্বর থেকে দ্বিতীয় ‘গ্লোবাল সোর্সিং এক্সপো’ আয়োজন করবে ইপিবি নারায়ণগঞ্জে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে বাবা ও ছেলে নিহত বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম কমল: প্রভাব ফেলছে জ্বালানি তেলের উত্তাপ ঢামেকে অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট: ভোগান্তিতে রোগী ও স্বজন

নদীর চরে বেঁচে থাকার লড়াই ও নতুন সম্ভাবনা

Reporter Name / ৪১ Time View
Update : শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬

নদীর বুকে নতুন নতুন চর জেগে ওঠা বাংলাদেশের প্রকৃতি ও জীবনচক্রের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার ও জিনজিরামের মতো নদীগুলোতে প্রতি বছর পলি জমে নতুন ভূখণ্ড সৃষ্টি হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০টি চর রয়েছে, যেখানে প্রায় ৮ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর ভূমি রয়েছে—যা দেশের মোট ভূমির ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২২ সালে পাউবোর পরিচালিত ‘চর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট প্রজেক্ট’ (সিডিএসপি) জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে। ড্রেজিংয়ের অভাব ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধার কারণে চর জেগে ওঠার এই হার বাড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নতুন পে-স্কেল / এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য লাগবে বাড়তি ১৩ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। ভারত-বাংলাদেশ কনস্যুলার সংলাপ শিগগির, হাসিনাকে ফেরাতে দিল্লিকে চাপ দেবে ঢাকা। আশা-নিরাশার বালুচরে বেঁচে থাকার লড়াই। মোটরসাইকেলের সামনেও থাকতে হবে নম্বর প্লেট। ‘বর্ষার পর চর যেমন জেগে ওঠে, তেমন এক রাতেই নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে। ‘১০ বছর আগে চর ছেড়ে সমতলে বাড়ি করেছিলাম, এক মাসের বেশি থাকতে পারিনি। সমতলে শান্তি পাই না,’ যোগ করেন তিনি। এ ছাড়া, অনেক ঘরেই রয়েছে সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা। পাউবোর উত্তরাঞ্চলীয় প্রধান প্রকৌশলী সরফরাজ বান্দা জানান, কুড়িগ্রাম থেকে পাবনার ঢালারচর পর্যন্ত আট শতাধিক স্থানে চর জেগে উঠেছে।

চরাঞ্চলের জীবন ও বাস্তবতা

  • নজু মিয়ার অভিজ্ঞতা: ৭০ বছর বয়সী এই কৃষকের জন্ম ও বেড়ে ওঠা চরে। সমতলে বসবাসের চেষ্টা করেও তিনি সফল হননি, কারণ চরের পরিবেশই তার কাছে আপন।
  • ফজলু মুন্সীর জীবন: ৮০ বছর বয়সী ফজলুর মতে, চরের জীবন হলো অস্থায়ী—চর জাগে, মানুষ বসতি গড়ে, আবার চর ডুবলে ঠিকানা বদলাতে হয়। তিনি জীবনে সাতবার এমন ভাঙনের শিকার হয়েছেন।
  • মোকছেদ আলীর মন্তব্য: ষাটোর্ধ্ব এই কৃষক জানান, চরে টিকে থাকার কৌশল জন্ম থেকেই আয়ত্ত করতে হয়। তবে বর্ষার ভাঙনে ঘর হারানো বা ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি সবসময়ই থাকে।

কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার ‘মানুষমারার চর’-এ বসতি গড়েছেন এমন প্রায় ৫০০ পরিবার যারা নদী ভাঙনে গৃহহীন হয়েছিলেন। একইভাবে পোড়ার চরেও প্রায় ৪০০ পরিবার নতুন জীবন শুরু করেছে। এখানকার বাসিন্দারা কৃষি কাজ এবং গরু-ছাগল পালনের মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য বদলানোর চেষ্টা করছেন। বিদ্যুৎ সুবিধা, সৌর বিদ্যুৎ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ছোট ছোট ব্যবসা গড়ে ওঠায় চরের জনজীবনেও আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। এক সময় শুষ্ক মৌসুমেও উত্তরাঞ্চলের যেসব নদী ছিল খরস্রোতা, এখন সেগুলোর বয়ে চলা অনেকটাই ধীর। তবে এসব চর এখন আর বিরান ভূমি নয়; গৃহহীন ও ভাঙনে নিঃস্ব মানুষের বসতি পাল্টে দিয়েছে চরের চিত্র। মাছ শিকারের পাশাপাশি চরের বাসিন্দারা পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন কৃষি ও পশুপালন। মানুষমারার চর নামে পরিচিত এই এলাকায় ভাঙনে বসতভিটা ও আবাদি জমি হারানো বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৫০০ পরিবার বসতি গড়ে তোলে। ব্রহ্মপুত্রের বয়ে আনা পলিতে তারা ফলাচ্ছেন সব ধরনের ফসল। তিনি চান, চরেই তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কাটুক। নজু বলেন, ‘আমি এখনো দিনভর শ্রম দিয়ে ফসল ফলাই।’। আঙুল গুনে শৈশব স্মৃতি থেকে এ পর্যন্ত হিসাব করে তিনি জানান, সাতবার তাকে চর বদলাতে হয়েছে। জন্ম যার চরে হয়, সে বাচ্চা শৈশবেই সব শিখে যায়,’ বলেন এই কৃষক। ষাটোর্ধ্ব এই কৃষক বলেন, ‘কৃষক বলতে পারে না ফসল ঘরে তুলতে পারবে কিনা। অক্টোবর থেকে জুন পর্যন্ত চর এলাকা ঘুরলে কেবলই চোখে পড়ে ফসলের সবুজ খেত। রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাকেন্দ্র, ডেইরি ফার্ম ও ছোট ছোট চালকল।

চরের উন্নয়নে বিশেষজ্ঞ মতামত ও সম্ভাবনা

  • চর মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাব: কুড়িগ্রাম চর উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবুর দাবি, চরাঞ্চলের সমস্যা ও সম্ভাবনা সঠিকভাবে নিরূপণে পৃথক ‘চর মন্ত্রণালয়’ গঠন করা প্রয়োজন। তার মতে, চরের প্রকৃত পরিস্থিতি মাঠপর্যায়ে না দেখলে অনুধাবন করা অসম্ভব।
  • অর্থনৈতিক বিবর্তন: ঘোড়া বা গরুর গাড়ির পরিবর্তে এখন চরে মোটরচালিত ভ্যানের ব্যবহার বেড়েছে। উৎপাদিত মরিচ, বাদাম, ভুট্টা, গমসহ বিভিন্ন ফসল এখন দেশের বাজারে সরবরাহ হচ্ছে।
  • নদী রক্ষা ও সেচ ব্যবস্থাপনা: পানি উন্নয়ন বোর্ডের রংপুর কার্যালয়ের কর্মকর্তা অমূল্য রায়ের মতে, এ অঞ্চলের কৃষি সম্পূর্ণ নদীনির্ভর। চরাঞ্চলে ৮-১০ ফুটের মধ্যে পানির স্তর পাওয়া গেলেও সমতলে তা ৩৫-১০০ ফুট গভীর।
  • গবেষকের দৃষ্টিভঙ্গি: নদী গবেষক ড. তুহিন ওয়াদুদ মনে করেন, নদী বাঙালি সংস্কৃতির অংশ। চরের বাসিন্দাদের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি নিয়মিত ড্রেজিং করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা জরুরি। নদী বাঁচলেই কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতি সুরক্ষিত থাকবে।

চরের বাসিন্দাদের কাছে নদী একদিকে যেমন ভাঙনের কারণ, অন্যদিকে উর্বর পলি ফেলে নতুন আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে। নিয়মিত নদী শাসন ও সঠিক পরিকল্পনা থাকলে চরাঞ্চলের বাসিন্দারা দেশের অর্থনীতির মূল ধারায় আরও বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে। এতে একদিকে যেমন তাদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে রাখছেন অর্থনীতিতে ভূমিকা। এই চরের বাসিন্দা নজু মিয়া বলেন, ‘এখানে আশা যেমন আছে, নিরাশাও আছে।’।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা