প্রতারণার ফাঁদে পড়ে কম্বোডিয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন প্রায় ১৮০০ বাংলাদেশি। ভালো বেতনের লোভনীয় চাকরির আশায় দেশটিতে পাড়ি দিলেও এখন তারা কার্যত সাইবার প্রতারণাকেন্দ্রের জিম্মি। অভিবাসন আইন অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের বেশি অবস্থান করলে দেশটিতে বড় অংকের জরিমানার বিধান রয়েছে। আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে আইনি এই জটিলতার সুরাহা না হলে তাদের দেশে ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে বলে জানিয়েছে অনির্বাণ সারভাইভার ভয়েস ফাউন্ডেশন। ৩১ অক্টোবরের মধ্যে এ বিষয়ে সমাধান না হলে প্রায় ১ হাজার ৮০০ বাংলাদেশির দেশে ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। জহির ইমাম জানান, কম্বোডিয়ায় আটকে পড়া ১ হাজার ৭৯৬ বাংলাদেশির বিষয়ে ফোনকল, ই-মেইল, সরাসরি আবেদন ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাধ্যমে তাদের কাছে অনুরোধ এসেছে।
মানিকগঞ্জের সিংগাইরের বাসিন্দা মোহাম্মদ জামিল ওরফে সেন্টুর মতো ভুক্তভোগীরা সাড়ে তিন বছর ধরে সেখানে আটকে আছেন। লালনের তিরোধান দিবসে ময়মনসিংহে বাউল গানের আসর।
সেন্টু জানান, তিনি একাধিকবার দেশে ফেরার জন্য টিকিট কিনলেও প্রতিবারই প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
বর্তমানে অন্যের জন্য রান্না করে যা পান, তা দিয়েই কোনোমতে টিকে আছেন তিনি।
অভিযোগ রয়েছে, অনেকের পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে তাদের সাইবার প্রতারণাকেন্দ্রে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে।
যারা পালানোর চেষ্টা করেছেন, তাদের সহ্য করতে হয়েছে শারীরিক নির্যাতন। সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করে নির্যাতনের শিকারও হয়েছেন কেউ কেউ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে ফেরার অপেক্ষায় আছেন প্রায় ১৩০০ থেকে ১৪০০ বাংলাদেশি। তবে ভুক্তভোগীদের নিয়ে কাজ করা অনির্বাণ সারভাইভার ভয়েস ফাউন্ডেশনের হিসাবমতে, এ সংখ্যা ২ হাজারের বেশি। ভুক্তভোগীদের সংগঠনটি জানিয়েছে, ৩১ অক্টোবরের সময়সীমা পার হলে তাদের জন্য আইনি জটিলতা আরও বাড়বে। এই পরিস্থিতি নিয়ে সমাধানের দাবিতে আজ রোববার প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেওয়ার কথা রয়েছে সংগঠনটির। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ বাংলাদেশি দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন। সংগঠনটির সভাপতি ও সহপ্রতিষ্ঠাতা আল আমিন নয়ন বলেন, ওই জরিমানা-সংক্রান্ত শর্ত, কারা এর আওতায় আসবেন, জরিমানা মওকুফের সুযোগ রয়েছে কি না, তা জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।
গত ৩ সেপ্টেম্বর নমপেন বিমানবন্দরে ৩২ বাংলাদেশিকে আটকের ঘটনায় এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা আবারও প্রকাশ্যে আসে। তাদের ইমিগ্রেশন ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয়েছিল। থাইল্যান্ডে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) জহির ইমাম জানান, ওই ৩২ জনের মধ্যে কয়েকজনকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে এবং বাকিদের দ্রুত দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। তবে অনেকেরই দেশে ফেরার টিকিট কেনার মতো সামর্থ্য নেই। প্রতিমন্ত্রী ইশরাকের অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনায় তদন্তের নির্দেশ ডিএমপির। বাংলাদেশ সফরের দলে পরিবর্তন আনল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। সেদিন কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনের বিমানবন্দরে দেশ ছাড়ার চেষ্টার সময় ৩২ বাংলাদেশিকে আটক করে দেশটির অভিবাসন পুলিশ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অভিবাসনসংক্রান্ত অনিয়ম ও যাচাই-বাছাইয়ের সময় অন্যান্য জটিলতা দেখা দেওয়ায় তাদের আটক করা হয়। আটক ৩২ জনের মধ্যে দুজনকে মুক্তি দেওয়া হলেও বাকি ৩০ জনকে দীর্ঘ কূটনৈতিক আলোচনার পর শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত একটি ইমিগ্রেশন ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয়েছিল। এর অনুলিপি দেওয়া হবে পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও।
কনস্যুলার কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যাংককস্থ মিশন জানিয়েছে, জুলাই থেকে এখন পর্যন্ত ৩৫০ থেকে ৪০০ বাংলাদেশি ফিরেছেন। তবে তালিকায় থাকা সবার সঠিক অবস্থান বা বর্তমান পরিস্থিতি যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কম্বোডিয়ার কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশিদের সাক্ষাৎকার নিয়ে মানব পাচারের শিকার কি না, তা যাচাই করার প্রক্রিয়া মাঝপথে বন্ধ রাখায় সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। মিশন থেকে এই যাচাইপ্রক্রিয়া পুনরায় চালুর জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। একইভাবে তালিকাভুক্ত প্রত্যেকের বর্তমান অবস্থান ও পরিস্থিতি সম্পর্কেও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরাও চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। কবির হোসেন নামের এক ব্যক্তি জানান, তার ছেলে শাওনকে আইটি খাতে উচ্চ বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে পাঠানো হয়েছিল। এখন পর্যন্ত শাওনের পেছনে প্রায় ১৩ লাখ টাকা খরচ হয়েছে, কিন্তু শাওন কোনো টাকা পাঠাতে পারেননি। ছেলেকে ফেরাতে বারবার ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি আবারও নতুন করে টিকিট কেনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দু-তিনবার টিকিট কিনেছি, কিন্তু তাতে শুধু টাকাই খুইয়েছি। বেসরকারি চাকরিজীবী কবির হোসেন বলেন, প্রায় দেড় বছর আগে তার ২৪ বছর বয়সী ছেলে শাওন কম্বোডিয়ায় যায়। কম্বোডিয়া যাওয়ার জন্য খরচ হওয়া ৬ লাখ টাকার বড় অংশই ধার করে জোগাড় করেছিল পরিবারটি। কবির বলেন, ‘এখন বুঝতে পারছি না, এই ঋণ কীভাবে শোধ করব। ছেলেকে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করতে গিয়ে দুইবার টাকা খরচ করেও কাজ হয়নি, টাকাও ফেরত পাইনি। আশা করি ১৯ বা ২০ অক্টোবর শাওন দেশে ফিরতে পারবে।’।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যানুযায়ী, গত বছরের শুরু থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার ৯৬৩ জন কর্মী কম্বোডিয়ায় যাওয়ার ছাড়পত্র পেয়েছেন। কিন্তু অভিবাসন বিশেষজ্ঞ শরিফুল হাসান প্রশ্ন তুলেছেন, সরকারি ছাড়পত্র দেওয়ার পরও কর্মীরা কোথায় এবং কী অবস্থায় কাজ করছেন, তার কোনো নজরদারি নেই। বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়ে গিয়ে প্রতারণার শিকার হওয়ার অনেক ঘটনা সামনে আসছে।
সম্প্রতি কম্বোডিয়ায় আটকে থাকা এমন তিন বাংলাদেশির মরদেহ দেশে আনা হয়েছে, যাদের একজন সোহাগ আহমেদ। অভিযোগ রয়েছে, তিনিও প্রতারণাকেন্দ্রের চক্রে আটকা পড়েছিলেন। শরিফুল হাসানের মতে, প্রতিটি ঘটনার দ্রুত তদন্ত করে আটকে পড়া বাংলাদেশিদের শনাক্ত করা এবং তাদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা এখন জরুরি।