বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১৭ অপরাহ্ন
শিরোনাম
নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের মাধ্যমে টেকসই অর্থনীতি রূপান্তরের ডাক জাপান সফরে চার সমঝোতা স্মারক ও দুই অনুদান চুক্তি সই জুলাইয়ের চেতনা বাঁচিয়ে রাখলে চাঁদাবাজি সম্ভব নয়: ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনতেই হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন দেশে ডেঙ্গুতে একদিনে ৯ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি প্রায় ২ হাজার জিম্বাবুয়েকে হারিয়ে টি-টোয়েন্টি সিরিজে এগিয়ে আফগানিস্তান ১৫ নভেম্বর থেকে দ্বিতীয় ‘গ্লোবাল সোর্সিং এক্সপো’ আয়োজন করবে ইপিবি নারায়ণগঞ্জে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে বাবা ও ছেলে নিহত বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম কমল: প্রভাব ফেলছে জ্বালানি তেলের উত্তাপ ঢামেকে অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট: ভোগান্তিতে রোগী ও স্বজন

প্রকাশ্যে বন্দুক হামলার নেপথ্যে অস্ত্রের সহজলভ্যতা ও উদ্বেগ

Reporter Name / ৭ Time View
Update : শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রকাশ্যে গুলি করে হামলার ঘটনা জনমনে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে। কখনো মসজিদের পাশে, আবার কখনো জনাকীর্ণ চায়ের দোকানের সামনে কিংবা নিজ বাড়িতেও ঘটছে এমন সহিংসতার ঘটনা। মোটরসাইকেলে করে এসে হেলমেট পরিহিত আততায়ীদের খুব কাছ থেকে গুলি ছুড়ে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার চিত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কীভাবে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে হত্যাকারীরা।

গত ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে চায়ের দোকান থেকে বের হওয়ার সময় গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় ১৮ অক্টোবর পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে। এর রেশ কাটতে না কাটতেই ১৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় রাজবাড়ী শহরের সজ্জনকান্দায় পিয়ারুল সরদারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। জানা যায়, পিয়ারুলের বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র ও মাদকসহ মোট ১৩টি মামলা ছিল। কয়েক দিনের ব্যবধানে একের পর এক গুলি করে হত্যা। তিনি বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন। বছরের প্রথম নয় মাসের হিসাবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০টি হত্যা মামলা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের কাছে ছোট আগ্নেয়াস্ত্রও রয়েছে।

একইদিন গভীর রাতে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ডে দুর্বৃত্তদের গুলিতে তারেক হোসেন বাপ্পি নামে এক যুবক নিহত হন। ওই হামলায় তাফসির আলম শাওন নামে আরেকজন গুলিবিদ্ধ হন। পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অলিনগর এলাকায় অতর্কিত এই হামলায় দুজন গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটে। বুকে গুলিবিদ্ধ পিয়ারুলকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর সঙ্গে থাকা আরেক ব্যক্তিও গুলিবিদ্ধ হন।

খুলনায় অপরাধী চক্রের দৌরাত্ম্য আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ৫ অক্টোবর রূপসা উপজেলায় আক্তার ঢালীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনার ৫০ দিন আগেই তাঁর ছেলে জয় ঢালীকে একইভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। ছেলের হত্যা মামলার বাদী পিতাকেই প্রাণ দিতে হওয়ায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া ১৭ অক্টোবর গভীর রাতে খুলনা নগরীর পশ্চিম টুটপাড়া এলাকায় মাস্ক পরা দুর্বৃত্তরা শেখ জুম্মান রহমান বিশাল নামে এক যুবককে গুলি করে তাঁর মোবাইল ফোন নিয়ে পালিয়ে যায়। এর এক দিন আগে, ৪ অক্টোবর, খুলনার দিঘলিয়ায় নাসিমুল গণি করিম ওরফে নাসিম নামে এক ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়।

রাজধানী ও এর আশেপাশেও লক্ষ্যভেদী হামলার ঘটনা কম নয়। ১৫ সেপ্টেম্বর কেরানীগঞ্জের আরশীনগরে সেলুনে ফরহাদ হোসেনকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ১২ জুন রামপুরা-হাতিরঝিল এলাকায় ইয়াসিন খান পলাশ গুলিবিদ্ধ হন এবং ২০ জুন চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি কাওরান বাজারেও প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটেছিল। শুধু জেলা শহর নয়, রাজধানী ও আশপাশের এলাকাতেও প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি রাজধানীর কাওরান বাজারে বসুন্ধরা সিটি শপিং মলের পেছনে গুলি করে হত্যা করা হয় ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মোসাব্বিরকে। নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে প্রতিপক্ষের কেউ কেউ হত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে।’।

পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ২,৬৫৯টি খুনের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই মামলার সংখ্যা ৮৮১টি।

অপরাধীদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র পৌঁছানোর উৎস নিয়ে গভীর শঙ্কা রয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এত আগ্নেয়াস্ত্র অপরাধীদের হাতে আসছে কোথা থেকে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থাপনা থেকে ৫,৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছিল। ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪,৪৫৭টি উদ্ধার হলেও এখনো ১,৩০৬টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তদন্তে দেখা গেছে, লুণ্ঠিত এসব অস্ত্রের একটি বড় অংশ অপরাধী চক্রের হাতে পৌঁছেছে। চট্টগ্রামে পুলিশের ওপর ছোড়া গুলি ও মিরপুরে উদ্ধার হওয়া বিদেশি পিস্তলের পরীক্ষা থেকে তা প্রমাণিত হয়েছে। শুধু অস্ত্র নয়, একই সময়ে লুট হওয়া ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮টি গোলাবারুদের মধ্যে ২ লাখ ৫৭ হাজার ১১৩টি উদ্ধার হয়নি। চট্টগ্রামে গত আগস্টে এক সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তারের অভিযানে পুলিশের দিকে ছোড়া গুলিতে ব্যবহৃত পিস্তল পরীক্ষা করে সেটি ২০২৪ সালে কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র হিসেবে শনাক্ত করা হয়।

লুণ্ঠিত অস্ত্রের পাশাপাশি সীমান্তপথে অবৈধ অস্ত্র চোরাচালান দীর্ঘদিনের উদ্বেগ। তবে বর্তমানে কোন রুটে কী পরিমাণ অস্ত্র ঢুকছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার ও দলীয় প্রভাব খাটানোর জন্য এসব অস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজনৈতিক ও স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ এবং অপরাধী চক্রের বিরোধকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু হত্যাকাণ্ড ঘটছে। ফলে অস্ত্রের উৎস শনাক্ত, সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া এবং অপরাধ সংঘটনের আগেই অস্ত্রধারীদের শনাক্ত করার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকে’ নামে একটি ফেসবুক পেজে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধ নিয়ে লেখালেখি করতেন। রাজধানীতেও থামছে না লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড। অন্যদিকে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকা দিয়ে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র প্রবেশের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অস্ত্রের সন্ধানদাতাদের পরিচয় গোপন রাখা এবং সরকারি নিয়মে পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।

অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে নিয়মিত অভিযানের দাবি জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, অপরাধীদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অস্ত্রও উদ্ধার করা হচ্ছে। রমনা বিভাগের উপকমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম এবং তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান জানিয়েছেন, অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জানিয়েছেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বাহারুল আল মনে করেন, লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার একটি কঠিন কাজ এবং আশানুরূপ সফলতা এখনো আসেনি।

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. কুদরাত-ই-খুদার মতে, আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা থেকে সংঘাত বাড়ছে। তাই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অস্ত্রধারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপের কোনো বিকল্প নেই। অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা যাতে মাথাচাড়া দিতে না পারে, সে জন্য পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।’। সবাই চেষ্টা করছে, কিন্তু এই চেষ্টা আরও জোরদার করতে হবে।’।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা