দেশের রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে আগামী ১৫ থেকে ১৭ নভেম্বর দ্বিতীয়বারের মতো ‘গ্লোবাল সোর্সিং এক্সপো’ আয়োজন করতে যাচ্ছে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। রাজধানীর পূর্বাচলে অবস্থিত বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী প্রদর্শনী কেন্দ্রে (বিসিএফইসি) তিন দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সার্বিক সহযোগিতায় ইপিবি এই প্রদর্শনীর আয়োজন করছে। বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং জ্বালানি নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের রপ্তানি সম্ভাবনা নিয়ে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সেমিনারে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ-পরবর্তী প্রস্তুতি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) প্রস্তুতি, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিসহ (ইপিএ) বিভিন্ন অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি। বাজারে প্রবেশাধিকার, বাণিজ্য সুবিধা, নিয়ন্ত্রক শর্ত এবং পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে এসব সেমিনারে আলোচনা হবে। নতুন বাজারে প্রবেশ এবং বিদ্যমান বাজারে অবস্থান সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের শর্ত ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড সম্পর্কে রপ্তানিকারকদের সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ হাসান আরিফ মেলা ও প্রদর্শনীর সার্বিক পরিকল্পনা তুলে ধরেন। এ অনুষ্ঠানে ইপিবির মহাপরিচালক-১ মোহাম্মদ শাফায়াত উল্লাহ বক্তব্য রাখেন এবং মেলা ও প্রদর্শনী বিভাগের পরিচালক (উপসচিব) মো. ওয়ারেস হোসেন পুরো কার্যক্রম পরিচালনা ও সঞ্চালনা করেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এবারের আয়োজনে রপ্তানিমুখী ১২টি খাতের ২০০টির বেশি স্টল থাকবে। প্রথমবারের মতো আয়োজিত প্রদর্শনীতে আটটি খাতের পণ্য প্রদর্শিত হয়েছিল এবং সেটিতে ১২৫টি প্রতিষ্ঠান মোট ১৬৪টি স্টল নিয়ে অংশ নিয়েছিল। প্রথম আসরের অভিজ্ঞতা ও ইতিবাচক সাড়ার ওপর ভিত্তি করে এবার স্টলের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করছে ইপিবি। তৈরি পোশাকশিল্পের পাশাপাশি অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতগুলোতেও রপ্তানি বাড়াতে সরকারের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি এই উদ্যোগে প্রতিফলিত হয়েছে।
প্রদর্শনীতে যেসব খাতের পণ্য প্রদর্শিত হবে তার মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হস্তশিল্প ও পাটজাত পণ্য, প্লাস্টিক পণ্য ও রান্নাঘরের সামগ্রী, আসবাব ও গৃহসজ্জা, ওষুধ, কৃষি ও কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্য, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, কাগজ ও মোড়কজাতকরণ, মোটরযান, হালকা প্রকৌশল এবং সিরামিক ও টেবিলওয়্যার। এই সম্প্রসারিত উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের সামগ্রিক শিল্পভিত্তির বৈচিত্র্য বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা এবং প্রচলিত রপ্তানি পণ্যের বাইরেও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আগ্রহ বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, এই প্রদর্শনী বাংলাদেশের স্থানীয় উৎপাদকদের সঙ্গে বিদেশি ক্রেতাদের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি চমৎকার সুযোগ তৈরি করবে। প্রতিকূল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মধ্যেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে উৎপাদকরা নতুন ব্যবসার ক্ষেত্র খুঁজে পাবেন, অধিক মূল্য সংযোজিত পণ্য আন্তর্জাতিক আমদানিকারকদের সামনে তুলে ধরতে পারবেন এবং বিশ্ববাজারে নিজেদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে পারবেন। এটি দেশের রপ্তানিকারক ও উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা ও দৃঢ়তার পরিচায়ক। ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা যেখানে সাধারণ ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের জন্যও উন্মুক্ত, সেখানে বৈশ্বিক পণ্য সংগ্রহ প্রদর্শনীটি মূলত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ (বি-টু-বি) বাড়ানোর লক্ষ্যে আয়োজন করা হচ্ছে।
মেলার মূল উদ্দেশ্য হলো দেশীয় উৎপাদকদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক আমদানিকারক, পণ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক অংশীদারের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ তৈরি করা। এই প্ল্যাটফর্মে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রস্তুতকৃত পণ্য প্রদর্শন, পণ্যের মান ও দরদাম নিয়ে আলোচনা, সরবরাহের সময়সূচি নির্ধারণ এবং সম্ভাব্য বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক আলোচনা সম্পন্ন করতে পারবে।
আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অংশগ্রহণ সহজ ও উৎসাহিত করতে নিবন্ধিত বিদেশি প্রতিনিধিদের জন্য বিশেষ আবাসনে ছাড়সহ নানা ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করেছে ইপিবি। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, নিবন্ধিত বিদেশি প্রতিনিধিরা ঢাকার তারকাখচিত হোটেলগুলোতে থাকার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় পাবেন। এছাড়া জাতীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্স ও বেসরকারি দেশীয় বিমান সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে বিমান টিকেটের মূল ভাড়ায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা ও বেসরকারি বাংলাদেশি বিমান সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে মূল বিমানভাড়ায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সুবিধার জন্য অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে ডিজিটাল ব্যবসায়িক যোগাযোগের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হচ্ছে। এর ফলে বিদেশি প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে আসার আগেই স্থানীয় উৎপাদকদের তথ্য ও পণ্য তালিকা পর্যালোচনা করতে পারবেন। পাশাপাশি মেলা চলাকালীন কারখানা পরিদর্শনের ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে, যার মাধ্যমে সম্ভাব্য আমদানিকারকরা উৎপাদনে ব্যবহৃত প্রযুক্তি, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সার্বিক সক্ষমতা সরেজমিনে পরীক্ষা করে দেখতে পারবেন।
বৈশ্বিক পণ্য সংগ্রহ প্রদর্শনীর পরপরই আগামী ১৮ ও ১৯ নভেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে ‘বাংলাদেশ অ্যাপারেল অ্যান্ড টেক্সটাইল এক্সপোজিশন’ (ব্যাটেক্সপো)। হাসান আরিফ জানান, পরপর দুটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রদর্শনীর আয়োজনের ফলে বিদেশি ক্রেতারা একই সফরে বাংলাদেশের একাধিক রপ্তানিমুখী খাত পরিদর্শনের সুযোগ পাবেন। এর ফলে পণ্য সংগ্রহকারী বিদেশি প্রতিনিধি ও ব্যবসায়ীদের সমন্বিত সফর অত্যন্ত সুবিধাজনক ও ফলপ্রসূ হবে।
ইপিবির সূত্রে জানানো হয়, ইউরোপের পর্তুগাল, ফ্রান্স, স্পেন ও যুক্তরাজ্য; এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও আফগানিস্তান; এবং আমেরিকা অঞ্চলের আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল থেকে সম্ভাব্য প্রতিনিধিদলের কাছ থেকে ইতিবাচক প্রাথমিক সাড়া ও অংশগ্রহণের আশ্বাস পাওয়া গেছে। ইপিবির পক্ষ থেকে বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা ও বৈশ্বিক রপ্তানি সম্ভাবনা বিশ্বমঞ্চে সঠিকভাবে তুলে ধরতে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমকে প্রদর্শনীটির প্রচারণায় সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়।