ইসরাইলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন (সিইসি) সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করেছে। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) ভোরে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। এর আগে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দেশটিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। শুক্রবার ভোরে দেওয়া এক বিবৃতিতে কমিশন জানায়, ভোটে ব্যাপক অনিয়মের যেসব খবর প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। এ তদন্ত কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করেও পরিচালিত হচ্ছে না।
গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।
মোট ৫৭ লাখ ১৬ হাজার ৬৬৫ জন নাগরিক ভোট দিয়েছেন। এই ফলাফলে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে। বিদায়ী নেসেটে এই জোটের ৬৮টি আসন থাকলেও এবার তা কমে ৫৩টিতে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুবিরোধী জোট ৪৮টি আসন এবং আরব দলগুলো রেকর্ড ১৯টি আসন পেয়েছে। ইসরাইলের পার্লামেন্টারি ইতিহাসে আরব দলগুলোর জন্য এটিই সর্বোচ্চ প্রাপ্তি। তবে জায়োনিস্ট জোটের সদস্যরা রা’আম বা জয়েন্ট লিস্টের সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করে দেওয়ায় নেতানিয়াহুবিরোধী শিবিরের জন্য এই আসনগুলো কাজে লাগানো কঠিন হতে পারে।
দলভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ২৭টি আসন পেয়েছে। এ ছাড়া ইয়াশার পার্টি ২১টি, বি’ইয়াচাদ ১২টি, জয়েন্ট লিস্ট ১১টি, দ্য ডেমোক্র্যাটস ৮টি এবং রা’আম ৮টি আসন নিশ্চিত করেছে। ইসরাইল বেইতেনু, ইউনাইটেড তোরাহ জুদাইজম এবং ওতজমা ইয়েহুদিত দলগুলো পেয়েছে ৭টি করে আসন। শাস ও রিলিজিয়াস জায়োনিজম পেয়েছে ৬টি করে আসন। নির্বাচনি বাধা ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট পেতে ব্যর্থ হয়েছে রিজার্ভিস্টস-ইকোনমিক পার্টি, পিপল অব ইসরাইল পার্টি এবং চারেদি পাবলিক পার্টি। ইয়োয়াজ হেন্ডেলের রিজার্ভিস্টস-ইকোনমিক পার্টি পেয়েছে ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ ভোট। ওফের উইন্টারের পিপল অব ইসরাইল পার্টি পেয়েছে ১ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট। আর ইসরাইলের অতি-রক্ষণশীল ইহুদি সম্প্রদায়ের বিকল্প রাজনৈতিক অবস্থানের কথা তুলে ধরা চারেদি পাবলিক পার্টি পেয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশ ভোট। চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী, নেতানিয়াহুপন্থি জোটের আসন সংখ্যা আগের পার্লামেন্টের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আগের পার্লামেন্টে দল দুটির আসন ছিল ১০টি।
নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ উঠলেও কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন তা প্রত্যাখ্যান করেছে। কাতারের প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টার যে দাবি তোলা হয়েছিল, তা ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন কমিশনের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডিন লিভনে। তিনি জানিয়েছেন, চলমান কোনো তদন্তই চূড়ান্ত ফলাফলে কোনো প্রভাব ফেলবে না। আগামী ১০ নভেম্বর নতুন পার্লামেন্ট নেসেটের শপথ গ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে। এর আগেই আগামী বুধবার প্রেসিডেন্টের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
সরকার গঠন নিয়ে দেশটিতে জটিল অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বর্তমান সমীকরণে কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের ওপর নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার চাপ বাড়ছে। তিনি ইতিমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছানো যায়। আরেকটি নির্বাচন এড়ানোর তাগিদ দিয়ে তিনি সবাইকে খোলা মন নিয়ে আলোচনায় বসার পরামর্শ দিয়েছেন। নতুন সরকার গঠন নিয়ে দরকষাকষির এই প্রক্রিয়া দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে চলতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ফলে সরকার গঠনের সমীকরণে তারা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনো পক্ষেরই নেই। ফল জমা দেওয়ার পর প্রেসিডেন্ট প্রত্যেক দলের নেতার সঙ্গে বৈঠক করবেন। পরবর্তী সরকার গঠনের দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে দলগুলোর সুপারিশ শুনবেন তিনি।