বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ করিডর হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। তেহরান সম্প্রতি প্রণালির একটি অংশকে ‘নিষিদ্ধ অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করার পরিকল্পনা জানিয়েছে। এই নতুন সীমানায় কোনো জাহাজ প্রবেশ করলেই সেটিকে ইরানের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ি জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এই নিষিদ্ধ অঞ্চলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে। তার ভাষ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের সীমারেখা থেকেই এই অঞ্চলটি শুরু হবে এবং তা হরমুজ প্রণালি হয়ে পারস্য উপসাগরের বিভিন্ন অংশে বিস্তৃত হবে। তবে এই নিষেধাজ্ঞার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বা কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি ইরান।
রেজায়ি আরও স্পষ্ট করেছেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে ‘নাশকতা, হুমকি ও সামরিক হামলা’ বন্ধ না করবে, ততক্ষণ ইরান হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক রাখার কোনো নিশ্চয়তা দেবে না। একই সঙ্গে, ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে হরমুজের জন্য একটি নতুন আন্তর্জাতিক নৌপথের মানচিত্র তৈরির কাজও এগিয়ে চলছে। দুই দেশ এই করিডরের ব্যবস্থাপনায় একমত হয়েছে এবং শীঘ্রই এ বিষয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এর আগে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি জানিয়েছিলেন, ওমানের সঙ্গে একটি সাময়িক নৌপথের সমঝোতা হয়েছে, যার কিছু অংশ ইরানের সমুদ্রসীমার ভেতর দিয়ে যাবে। তবে এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক বিরোধ। এপ্রিলে ইরান নিজস্ব নৌপথের মানচিত্র প্রকাশ করলে ওমান জুনে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) সহায়তায় দক্ষিণ অংশে একটি বিকল্প করিডর নির্ধারণ করে।
এই বিকল্প পথ ব্যবহারের ফলে লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী ট্যাংকার ‘স্টোয়িক ওয়ারিয়র’-এর মতো জাহাজগুলো সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানের উপকূল ঘেঁষে চলাচল শুরু করে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) হুঁশিয়ারি দেয় যে, ইরানের অনুমোদিত পথ ছাড়া অন্য কোনো পথে চলাচলকারী জাহাজকে বিপজ্জনক পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।
দুই দেশের এই সামরিক উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে। ১৭ জুন জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল, যেখানে ৩০ দিনের মধ্যে নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া এবং ৬০ দিন মাশুল ছাড়া জাহাজ চলাচলের সুযোগ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পুনরায় হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালি কার্যত যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং ইরানি ট্যাংকারে হামলার মতো ঘটনা ঘটছে। স্থানীয় গণমাধ্যমের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের একটি জাহাজ নিষিদ্ধ এলাকায় ঢোকার চেষ্টা করলে সেটিতে হামলা চালানো হয়েছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স এই দাবিকে ‘পুরোপুরি মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচলের ওপর এর প্রভাব পড়েছে মারাত্মকভাবে। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন ১৩০টির বেশি জাহাজ হরমুজ দিয়ে যাতায়াত করত। সামুদ্রিক বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ দিনে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ১০টি পণ্যবাহী জাহাজ এই পথ ব্যবহার করেছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, গত রবিবার শেষ হওয়া ৪৮ ঘণ্টায় মাত্র ৫৯টি জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।
জ্বালানি প্রবাহের চিত্রও একই রকম হতাশাজনক। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট জানান, যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এই পথে প্রবাহিত হতো, যা এখন কমে ৯০ লাখ ব্যারেলে নেমেছে। এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৯ জন নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এই নিষিদ্ধ অঞ্চল কার্যকর করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও বড় সামরিক প্রতিক্রিয়ার দিকে ঠেলে দিতে চাইছে। সান ফ্রান্সিসকো বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডল ইস্টার্ন স্টাডিজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান স্টিফেন জুনস মনে করেন, ইরানের পক্ষে এই অঞ্চল কার্যকর করা সামরিকভাবে বেশ কঠিন। কারণ, এর জন্য মোতায়েন করা যুদ্ধজাহাজ ও বিমান মার্কিন হামলার সহজ লক্ষ্যে পরিণত হবে।
জুনসের মতে, এটি হয়তো একটি সতর্কবার্তা, যার মাধ্যমে জাহাজ কোম্পানিগুলোকে তেহরানের অনুমতি ছাড়া চলাচলের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা হচ্ছে। ওমানের সঙ্গে আলোচনা সফল হলে ইরান হয়তো এই কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি কেবল একটি তেল পরিবহনের পথ নয়, বরং এটি এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক সংঘাতের প্রধান মঞ্চ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ পরিস্থিতিকে ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি’ হিসেবে দেখছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান ও ওমানের সমুদ্রসীমার মধ্য দিয়ে যাওয়া এই করিডরে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব থাকবে ইরানের। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ওই পথ আগের তুলনায় ইরানের উপকূলের অনেক কাছ দিয়ে গেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: উদ্দেশ্য ছিল প্রণালিতে নিরাপদে জাহাজ চলাচল ফিরিয়ে আনা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রতিদিন ১৩০ জাহাজ থেকে এখন মাত্র ১০। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গত বুধবার মাত্র ছয়টি, মঙ্গলবার ১১টি এবং সোমবার পাঁচটি জাহাজ প্রণালিটি পার হয়েছে।