সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বর্তমানে ৮০ ও ৯০-এর দশকের নস্টালজিয়া এক প্রবল ঢেউ তুলেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে অনেকেই নিজেদের বর্তমান ছবিকে সেই সময়ের আদলে রূপান্তর করছেন। একই সঙ্গে তারা আক্ষেপ করছেন যে, সেই সোনালি সময় হারিয়ে গেছে এবং বর্তমান প্রজন্ম এক ধরনের অধঃপতনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তবে এই অনুভূতি নতুন নয়; মাঝেমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমগুলো এমন স্মৃতিচারণমূলক পোস্টে ভরে ওঠে, যেখানে দাবি করা হয় যে আগের জীবন অনেক বেশি সুন্দর ছিল।
জেন জি প্রজন্মের একজন সদস্য হিসেবে অতীতকে এমন রঙিন চশমায় দেখার বিষয়টি বেশ বিস্ময়কর। নস্টালজিয়া মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি হলেও, একটি কাল্পনিক স্বর্ণযুগ এবং বর্তমানের হঠাৎ অধঃপতনের ধারণাটি বেশ জটিল। বর্তমান পৃথিবী শূন্য থেকে তৈরি হয়নি; এটি ৮০, ৯০, ২০০০ এবং ২০১০-এর দশকের ধারাবাহিক বিবর্তনের ফসল। আজ আমরা যে সমাজে বাস করছি, তা এই দশকগুলোর সম্মিলিত অবদান।
এখানেই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে—আজকের দেশ কারা পরিচালনা করছেন? বর্তমানের নীতিনির্ধারক, আমলা, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব এবং রাজনৈতিক নেতাদের বড় একটি অংশ সেই ৮০ ও ৯০-এর দশকেই বেড়ে উঠেছেন। যে সমাজ ও প্রতিষ্ঠান নিয়ে আমরা আজ অভিযোগ করছি, তা গড়ে তোলার পেছনে তাদের দীর্ঘ বছরের ভূমিকা রয়েছে। যদি সেই সময়টি সত্যিই এত চমৎকার হয়ে থাকে, তবে প্রাতিষ্ঠানিক উৎকর্ষ, নাগরিক সংস্কৃতি, জবাবদিহি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের বর্তমান করুণ দশা কেন?
তরুণ প্রজন্মকে সাংস্কৃতিকভাবে নিকৃষ্ট বলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। কারণ, এই সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা তাদের উত্তরাধিকার হিসেবেই পেয়েছে। অতীতে আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তন নিয়ে গভীর কোনো একাডেমিক গবেষণা হয়নি। ২০১০-এর দশক পর্যন্ত জনপরিসর মূলত নগরভিত্তিক অভিজাত শ্রেণি ও সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রকদের দ্বারা প্রভাবিত ছিল। তারা কেবল সমাজের সেই অংশটুকুই তুলে ধরতেন, যা তাদের কাছে সম্মানজনক মনে হতো।
যেসব বিষয়কে আজ ‘অশ্লীল’ বা ‘রুচিহীন’ বলা হচ্ছে, সেগুলো বরাবরই জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ ছিল। মূলধারার গণমাধ্যমে প্রবেশাধিকার না থাকায় সেগুলো আড়ালে ছিল। উদাহরণস্বরূপ, হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য মূলধারার মধ্যবিত্তের রুচিকে প্রতিনিধিত্ব করলেও, কাসেম বিন আবু বকরের বইও তখন বিপুল জনপ্রিয় ছিল। সাংস্কৃতিক অভিজাতরা তাকে মনোযোগের যোগ্য মনে না করায় তার জনপ্রিয়তা তাদের চোখে পড়েনি।
প্রযুক্তি এখন সেই নিয়ন্ত্রণের দেয়াল ভেঙে দিয়েছে। স্মার্টফোন ও সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে হিরো আলম বা প্রিন্স মামুনের মতো ব্যক্তিরা মূলধারার গণমাধ্যমের অনুমতি ছাড়াই বিপুল দর্শক তৈরি করতে পারছেন। যখন এই ব্যক্তিরা অভিজাতদের ছাপিয়ে যান, তখনই ‘নান্দনিক রুচির দুর্ভিক্ষ’ নিয়ে আক্ষেপ শুরু হয়। হয়তো সমাজ রসাতলে যাচ্ছে না, বরং যা আগে অদৃশ্য ছিল, এখন তা প্রকাশ্যে আসছে।
পরিশেষে, ৮০ ও ৯০-এর দশকের নস্টালজিয়ার বড় সমস্যা হলো, আমরা কেবল ভালো লাগার অংশগুলোই মনে রাখি। বর্তমানের বাস্তবতা ব্যাখ্যা করতে সক্ষম বিষয়গুলো আমরা এড়িয়ে যাই। যারা সেই গৌরবময় সময়ে বেড়ে উঠেছেন, তাদের নিজেদেরই প্রশ্ন করা উচিত—যে সমাজ তারা গড়ে তুলেছেন, তার বর্তমান অবস্থা এত নাজুক কেন? প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সবাই যেন বর্তমান সময়ের নিজেদের ছবিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মাধ্যমে ৮০ ও ৯০-এর দশকের অবয়বে রূপ দিচ্ছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০২৬ সালের এই পৃথিবী একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আয় গোপনে জরিমানা হওয়া উচিত প্রমাণসাপেক্ষে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এআইয়ের ছোঁয়া হয়তো নতুন, কিন্তু এই অনুভূতি মোটেও নতুন নয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আমরা সবাই জীবনের কিছু সময়, বিশেষ করে শৈশব ও কৈশোরকে রোমান্টিকভাবে স্মরণ করি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কথিত সেই উন্নততর সামাজিক মূল্যবোধই বা কোথায়।