ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতির ধারাবাহিক আলোচনায় আজ পঞ্চম পর্ব। উপনিবেশ বিস্তারের নেশায় ইউরোপীয় শক্তিগুলো এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকায় কী ধরনের অমানবিক পদ্ধতি অবলম্বন করেছিল, তা ইতিহাসে সুস্পষ্ট। স্প্যানিশ অভিযাত্রী ফ্রান্সিসকো পিজারোর দল যখন ১৫৩২ সালের মধ্য নভেম্বরে ইনকা সাম্রাজ্যের কাজামারকা নগরে প্রবেশ করে, তখন তাদের উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট। সম্রাট আতাহুয়ালা অত্যন্ত সৌজন্যের সঙ্গে একটি স্বর্ণখচিত সিংহাসনে চড়ে তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। অথচ পিজারোর দেড় শতাধিক সশস্ত্র সঙ্গী সাক্ষাৎ হওয়া মাত্রই তাদের ওপর চড়াও হয়। পিজারোর দলের সাথে থাকা এক যাজক নিজেদের তথাকথিত ঈশ্বরের প্রতিনিধি দাবি করে সম্রাটের হাতে বাইবেল তুলে দেন এবং তাকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার আহ্বান জানান। এই ঘটনার পর শুরু হয় চরম বিশ্বাসঘাতকতা।
ইনকা সম্রাটকে বন্দি করে পিজারোর বাহিনী শহরজুড়ে চালায় লুটতরাজ ও হত্যাযজ্ঞ। মুক্তিপণ হিসেবে সম্রাটের কাছ থেকে আদায় করা হয় ঘরভর্তি স্বর্ণ ও রৌপ্য, যা বর্তমান বাজার মূল্যে প্রায় অর্ধ-বিলিয়ন ডলারের সমান। কিন্তু সব সম্পদ হস্তগত করার পরও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে ১৫৩৩ সালের আগস্টে একটি যন্ত্রের মাধ্যমে সম্রাট আতাহুয়ালাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। এই পৈশাচিক ঘটনার মাধ্যমে শুরু হওয়া উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়া ১৫৭২ সালের মধ্যে ইনকা সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটায়।
উত্তর আমেরিকায় ব্রিটিশ শক্তির ভূমিকাও ছিল একই রকম। ১৬০৭ সালের মে মাসে ভার্জিনিয়া কোম্পানির অধীনে ১০৪ জনের একটি সশস্ত্র দল জেমসটাউনে বসতি স্থাপনের নামে হাজির হয়। সেখানে বসবাসকারী পাওহাটান জনগোষ্ঠীর সাথে শুরুতে কোনো বিরোধ না থাকলেও, ১৬১০ সালের তীব্র শীত ও খাদ্যাভাবের অজুহাতে ইংরেজরা স্থানীয়দের ওপর চড়াও হয়। ইংরেজ গভর্নর পাওহাটান প্রধানের কাছে তাদের লোক ফেরত চাইলে এবং উত্তর মনমতো না হওয়ায় প্রতিশোধমূলক হামলা চালানো হয়। এতে ১৫-১৬ জন স্থানীয় মানুষ প্রাণ হারান, বসতবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয় এবং রানী ও তার সন্তানদের অপহরণ করে শিশুদের নদীতে ফেলে দেয়া হয়।
ফরাসি ঔপনিবেশিক শক্তির নৃশংসতার প্রতীক হিসেবে কর্নেল লুসিয়েন দ্য মন্তানিয়াকের নাম উল্লেখযোগ্য। আলজেরিয়ায় গণহত্যায় জড়িত এই সামরিক কর্মকর্তা তার চিঠিতে বয়সের ভেদাভেদ না করে স্থানীয়দের সমূলে বিনাশ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাদের মূল লক্ষ্যই ছিল লুটতরাজ ও আধিপত্য বিস্তার। খ্রিস্টধর্মের নামে পোপের ১৪৯৩ সালের ফতোয়া এবং গীতসংহিতা ও রোমীয় বাণীতে বর্ণিত অস্পষ্ট ধর্মীয় নির্দেশ ব্যবহার করে আদিবাসীদের জমি দখলের যৌক্তিকতা তৈরির চেষ্টা করা হয়। ঔপনিবেশিক শক্তির এই ধারাবাহিক নিপীড়ন, দাস ব্যবসা ও লুণ্ঠনের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল, তা আজও সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথ্যসূত্র ও সহায়িকা প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি- ৫। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সম্রাট আতাহুয়ালা সোটোর প্রার্থনা মঞ্জুর করলে, মধ্য নভেম্বরে, পিজারোর দলটি কাজামারকা নগরে প্রবেশ করে এবং পরদিনই নগরীর কেন্দ্রীয় উন্মুক্ত চত্বরে উভয় পক্ষের সৌজন্য সাক্ষাতের আয়োজন করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সম্রাট আতাহুয়ালা রাজকীয় পোশাকে, খোস মেজাজে, একটি স্বর্ণখচিত বহনযোগ্য সিংহাসনে চড়ে, উৎসবের ঝলমলে পোশাক পরিহিত পারিষদবর্গ ও স্থানীয় পোশাকি অস্ত্রে সজ্জিত প্রহরীর দল সমভিব্যাহারে যথাস্থানে হাজির হন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পিজারোর দলের সঙ্গে এই সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎকে ইনকা সম্রাট একটি নিতান্তই ‘ধর্মীয় আচার’ হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন, ফলে তার সেনাদলকে নগরের দূরবর্তী প্রান্ত অঞ্চলে অবস্থানের নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই অনাকাঙ্ক্ষিত সব প্রস্তাবে ইনকা সম্রাট বিস্মিত, অপমানিত ও রাগান্বিত হয়ে প্রত্যাখ্যান করলে, সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য ইতিপূর্বে প্রস্তুত পিজারোর দল প্রায় নিরস্ত্র ইনকা সম্রাট ও তার পরিষদবর্গের ওপর রক্তাক্ত হামলা পরিচালনা করে সম্রাটকে বন্দি করে ফেলতে সমর্থ হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এভাবেই, ওয়েলম্যানের ভাষায়, ‘ইনকা সম্রাটের আপ্যায়নের ঋণ রক্ত নিয়ে পরিশোধ করা হয়’।২১। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সম্রাটকে বন্দি অবস্থায় রেখে, পিজারো বাহিনী পুরো নগর জুড়ে হত্যাযজ্ঞ ও লুটতরাজের মাধ্যমে প্রভূত সম্পদ, বিশেষত সোনা ও রূপা আহরণ করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইনকা সম্রাটকে মুক্তিদানের প্রতারণামূলক অঙ্গীকারের ভিত্তিতে সম্রাটের কাছ থেকে ‘একটি ঘরভর্তি পরিমাণ স্বর্ণ ও কয়েকটি ঘরভর্তি পরিমাণ রৌপ্য’ আদায় করে, যা বর্তমান বাজার মূল্যে অর্ধ-বিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পদের সমান।২২ কিন্তু বিনিময়ে ইনকা সম্রাটকে পূর্ব-প্রতিশ্রুত।