ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা দখল করেছে ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী। কয়েক দিন ধরে চলা তীব্র স্থলযুদ্ধের পর বৃহস্পতিবার সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেয় তারা। এই ঘটনাকে ইয়েমেন সংঘাতের অন্যতম বড় মোড় হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। মোখা দখলের খবরের পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা গত কয়েক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
ইয়েমেনবিষয়ক গবেষক ফারেয়া আল-মুসলিমি সতর্ক করে বলেছেন, মোখার নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও তাদের মিত্ররা নতুন করে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়বে। নিউ আমেরিকার ফেলো অ্যাডাম ব্যারনও একে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পরিবর্তন হিসেবে অভিহিত করেছেন। মোখা লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের বাব আল-মান্দাব প্রণালি থেকে ৫০ মাইলেরও কম দূরত্বে অবস্থিত। ঐতিহাসিকভাবে কফি রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই শহরটি এখন সামুদ্রিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বড় প্রভাবক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হুথিদের রাজনৈতিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল-বুখাইতি জানিয়েছেন, তাদের মূল লক্ষ্য ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। তিনি দাবি করেন, তাদের উদ্দেশ্য ভূখণ্ড সম্প্রসারণ নয়। এদিকে, মোখা থেকে সরে যাওয়ার পর সরকারি বাহিনীর লেফটেন্যান্ট জেনারেল তারেক সালেহ জানিয়েছেন, তিনি সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের সঙ্গে পরামর্শ করেই বাহিনী পুনর্গঠন ও বিকল্প কমান্ড সেন্টার স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মোখার পাশাপাশি হুনাইশ ও জুকার দ্বীপ থেকেও সরকারি বাহিনী সরে গেছে বলে জানা গেছে, তবে বাব আল-মান্দাবের পেরিম বা মায়ুন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে রয়েছে তা এখনো অস্পষ্ট।
২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখলের পর থেকে ইয়েমেনে সংঘাত চলছে, যা পরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলার কারণে দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়। ২০২২ সালের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ায় সাম্প্রতিক মাসগুলোতে লড়াই তীব্র হয়েছে। হুথি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, সৌদি আরব তাদের মিত্রদের সহায়তায় ইয়েমেনে শতাধিক বিমান হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে, সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে সাম্প্রতিক হুথি হামলায় তাদের দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ৭০ জনের বেশি বেসামরিক মানুষ আহত হয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, হুথিরা এখন বাব আল-মান্দাবের কাছাকাছি এলাকা এবং লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে পারে। যদি তারা সফল হয়, তবে হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি বাব আল-মান্দাব প্রণালির ওপরও ইরান ও তার মিত্রদের আংশিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। যদিও হুথিদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে যে সমুদ্রপথে নৌ চলাচল নিরাপদ রয়েছে এবং পশ্চিম ইয়েমেনের বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ শেষ হয়েছে।
সৌদি আরবের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দেশটি সংঘাতে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়তে চায় না। এর পরিবর্তে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে ইয়েমেন সরকারকে সহায়তা দেওয়ার দিকেই তাদের মূল মনোযোগ। তবে ফারেয়া আল-মুসলিমির ধারণা, সৌদি বিমান সহায়তায় ইয়েমেন সরকার মোখা পুনর্দখলের চেষ্টা করতে পারে। লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলকারী সৌদি তেলবাহী ট্যাংকারের ওপর গত জুলাই থেকে হুথিদের অবরোধ এবং নিয়মিত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বর্তমানে তুঙ্গে রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নিরাপত্তাজনিত কারণে সরকারি কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব কথা বলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সৌদি সরকার এসব দাবির বিষয়ে মন্তব্য করেনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথে চলাচলকারী জাহাজের ওপর চাপ সৃষ্টির সক্ষমতা বাড়তে পারে, প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দিতে পারে এবং জ্বালানি বাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এরপর সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট ইয়েমেন সরকারকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বিমান হামলা শুরু করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এতে দেশটি দীর্ঘস্থায়ী ও ভয়াবহ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দক্ষিণ ইয়েমেনের অন্যান্য গোষ্ঠী রাজনৈতিক সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় থাকতে পারবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।