ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি সুদীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তার করেছে। ২০০১ সালে বর্ণবাদ, জাতিগত বৈষম্য, জেনোফোবিয়া এবং সংশ্লিষ্ট অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে আয়োজিত ডারবান সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, উপনিবেশবাদ বর্ণবাদ ও অসহিষ্ণুতার জন্ম দিয়েছে। আফ্রিকা ও এশীয় বংশোদ্ভূত মানুষসহ আদিবাসীরা ঐতিহাসিকভাবে উপনিবেশবাদের শিকার হয়েছে এবং আজও তারা এর নেতিবাচক পরিণতির ভার বহন করছে।
রাজনীতি সচেতন মহলে উপনিবেশবাদ বা ‘কলোনিয়ালিজম’ শব্দটি বহুল আলোচিত। এই শব্দটি মূলত ল্যাটিন ভাষা থেকে বিবর্তিত হয়ে ইংরেজিতে এসেছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এই শব্দটি রাজনৈতিক অভিধানে জায়গা করে নেয়, যার অর্থ দাঁড়ায় এমন এক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কোনো শক্তিশালী দেশ অন্য কোনো অঞ্চল বা দেশে নিজেদের লোক পাঠিয়ে বসতি স্থাপনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে। তবে এই দখলদারত্ব কখনোই সহজ ছিল না; বরং বলপ্রয়োগ, কৌশল এবং ছলচাতুরীর আশ্রয় নিতে হয়েছে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোকে।
ঔপনিবেশিক তত্ত্ব বিশ্লেষণে পণ্ডিতদের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। রুশ বিপ্লবের নেতা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন ১৯১৭ সালে সাম্রাজ্যবাদকে পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন, যার একটি অবিচ্ছেদ্য উপাদান হলো উপনিবেশবাদ। অন্যদিকে, মার্কিন বুদ্ধিজীবী এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাঈদ উপনিবেশবাদকে সাম্রাজ্যবাদের কুফল হিসেবে সৃষ্ট প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেছেন, যেখানে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র দূরবর্তী কোনো অঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণ করে। সাঈদ তার গবেষণায় মিশেল ডয়েলের সাম্রাজ্যবাদের সংজ্ঞাকে উদ্ধৃত করেছেন, যা মূলত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা ও তা টিকিয়ে রাখারই এক পদ্ধতি।
উপনিবেশবাদের এই তাত্ত্বিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু গ্রন্থের ভূমিকা রয়েছে
ঐতিহাসিকভাবে দেখলে, পঞ্চদশ শতাব্দীর শুরু থেকে বিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত প্রায় ৫০০ বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল ইউরোপীয় আধিপত্যের অধীনে ছিল। পর্তুগাল ও স্পেনের সমুদ্র অভিযানের মাধ্যমে পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে উপনিবেশবাদের প্রাথমিক যাত্রা শুরু হয়, যা উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার বিশাল এলাকাকে তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। পরবর্তীতে সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স ও ব্রিটেন করপোরেট কোম্পানির মাধ্যমে তাদের বাণিজ্যিক প্রভাব বিস্তৃত করে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এই ঔপনিবেশিক শোষণের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রসারের পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি ছিল তাদের শিল্প ও ভোক্তা অর্থনীতির প্রয়োজন। ক্যারিবীয় অঞ্চলে চিনির চাহিদা এবং এশিয়ায় চা, মসলা ও বস্ত্র ব্যবসার প্রসার ঘটানোর লক্ষ্যে তারা বিভিন্ন অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করে। এই ঔপনিবেশিক শাসন শুধু ভৌগোলিক দখলদারত্বেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার মতো মৌলিক ক্ষেত্রগুলোতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই কাঠামোগত পরিবর্তন ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাগুলো সমসাময়িক সমাজ ও রাষ্ট্রে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করেছে, যা আজকের দিনেও উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্রসমূহের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি – ১। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: Colonialism has led to racism, racial discrimination, xenophobia and related intolerance [। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: Africans and people of African descent, and people of Asian descent and indigenous peoples were victims of colonialism and continue to be victims of its consequences. -Durban Declaration of the World Conference against Racism, Racial Discrimination। 2001. প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহের সাধারণ পরিচয় এবং পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের বিস্তার ও শাসন-শোষণের নির্দিষ্ট সময়কাল সম্পর্কে ধারণাও আমাদের এই আলোচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন অধিকৃত অঞ্চলে নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য উপনিবেশবাদ কী কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, বিশেষত উপনিবেশিত অঞ্চলের ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার রাজনৈতিক পুনর্গঠনের ভেতর দিয়ে উপনিবেশবাদ কীভাবে কাজ করে গেছে, সেই আলোচনাটি তার পর্যালোচনা জরুরি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরিশেষে আমরা আলোচনা করব, ঔপনিবেশিক শাসনের প্রত্যক্ষ অবসানের পরও ‘স্বাধীন’ দেশগুলোতে কীভাবে নানা ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা রাষ্ট্রের জনস্বার্থপরায়ণ গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে অন্তরায় হিসেবে জারি থাকে এবং সেই অন্তরায়গুলো অতিক্রম করার জন্য কীভাবে ঔপনিবেশিক অবশেষগুলোর। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: উপনিবেশবাদ শব্দটি, রাজনীতি-সচেতন পাঠকমাত্রই অবগত, ইংরেজি ‘colonialism’ শব্দের বাংলা অনুবাদ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চিরায়ত ল্যাটিন ভাষায় ‘colonialism’-এর প্রতিশব্দ না থাকলেও, ভাষার বিবর্তন প্রক্রিয়ায় ল্যাটিন ‘পড়ষবৎব’ আর ‘পড়ষড়হরধ’ শব্দযুগল মিলে ইংরেজিতে ‘পড়ষড়হরধষরংস’ শব্দটি গঠিত হয়েছে।