বাংলাদেশে সাশ্রয়ী এবং নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সেবা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস পিএলসি বা বিএসসিপিএলসির একচেটিয়া আধিপত্য প্রধান অন্তরায় হয়ে দেখা দিয়েছে। বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা না থাকায় ব্যান্ডউইথের দাম, ইন্টারনেটের মান এবং গ্রাহক পর্যায়ে খরচের ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। মঙ্গলবার রাজধানীর মহাখালীর রাওয়া কনভেনশন হলে টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত এক সেমিনারে এমন চিত্রই উঠে এসেছে। ‘সবার জন্য সাশ্রয়ী ইন্টারনেট ও টেক জায়ান্টদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ: বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞরা অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করার জোর তাগিদ দিয়েছেন।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের প্রকল্প প্রধান মাহমুদ শাহেদ এবং আইএসপিএবির কোষাধ্যক্ষ মইন উদ্দিন আহমেদ। উপস্থাপনায় জানানো হয়, বিএসসিপিএলসি সি-মি-উই-৪ ও সি-মি-উই-৫ সাবমেরিন ক্যাবলে মোট ৮১৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছে। ২০০৮ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আয় করেছে এবং এর নিট মুনাফার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৬২ কোটি টাকার ওপরে। বিশ্লেষকদের মতে, একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ থাকায় গ্রাহকরা এর যথাযথ সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বর্তমানে বাংলাদেশ প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ জিবিপিএস আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ ব্যবহার করছে, কিন্তু একাধিক সাবমেরিন ক্যাবল বা বিকল্প আন্তর্জাতিক রুটের অভাবের কারণে বাজারে প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না।
ব্যান্ডউইথের অস্বাভাবিক মূল্য হ্রাসের তুলনামূলক চিত্র অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয়। ২০০৬ সালে বিটিসিএল প্রতি এমবিপিএস ব্যান্ডউইথ ৭৫ হাজার টাকায় বিক্রি করত। এরপর বিএসসিপিএলসি কার্যক্রম শুরুর ১০ বছর পর ২০১৬ সালে সেই খরচ নেমে আসে ৫০০ টাকায়। বর্তমানে সমপরিমাণ ব্যান্ডউইথ ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল চালু হয়ে বাজারে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা তৈরি হলে ২০২৭ সালের মধ্যে ব্যান্ডউইথের এই দাম ৬০ থেকে ৭০ টাকায় নামিয়ে আনা সম্ভব। এই লক্ষ্য অর্জনে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ সহজ করা এবং ল্যান্ডিং স্টেশনে সবার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা অপরিহার্য বলে মনে করছেন তারা।
সেমিনারে বক্তারা জানান, গুগল, মেটা, আকামাই ও ক্লাউডফ্লেয়ারের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান অবকাঠামো বড় চ্যালেঞ্জ। মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের পরিচালক ও সিইও আমিনুল হাকিম স্পষ্ট করে বলেন, বিএসসিপিএলসির এই একচেটিয়া ব্যবস্থা বহাল রেখে মানসম্মত ইন্টারনেট নিশ্চিত করা অসম্ভব। প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমেই কেবল এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব, যার সুফল প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছাবে।
অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন টিআরএনবির সাবেক সভাপতি সমীর কুমার দে এবং সভাপতিত্ব করেন বর্তমান সভাপতি মাসুদুজ্জামান রবিন। এছাড়া সিডিনেট কমিউনিকেশনের সিইও মশিউর রহমান এবং বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশনের সিইও এএইচএম বজলুর রহমান আলোচনায় অংশ নেন। বক্তারা একমত পোষণ করেন যে, স্থিতিশীল এবং প্রযুক্তি-নিরপেক্ষ নীতিমালার মাধ্যমে বিএসসিপিএলসির এই মনোপলির অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক ডিজিটাল হাবে পরিণত করার এখনই সময়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মহাখালীর রাওয়া কনভেনশন হলে এ সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনায় দেশের আন্তর্জাতিক সংযোগ, সাবমেরিন ক্যাবল খাত ও ইন্টারনেট অবকাঠামোর বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চলতি বছরে একই পরিমাণ ব্যান্ডউইথ বিক্রি করা হচ্ছে ১২০ টাকায়। চাকরির আরও তথ্য: তবে বিএসসিপিএলসির মনোপলি নির্ভর পরিবেশ, আন্তর্জাতিক সংযোগের সীমাবদ্ধতা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং অনুকূল নীতিমালার অনুপস্থিতির কারণে বাংলাদেশে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও হাইপারস্কেলাররা বিনিয়োগে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।