প্রায় দুই দশক ধরে ফুটবল বিশ্বকে আচ্ছন্ন করে রাখা বিতর্কটি ছিল লিওনেল মেসি নাকি ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো—কে সর্বকালের সেরা? দুজনের ক্যারিয়ার সমান্তরালভাবে এগিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষলগ্নে এসেও তারা যেন মুখোমুখি। তবে শেষ সময়ে এসে তাদের বিদায়ের চিত্রনাট্য ভিন্ন। মেসির বিদায় যেখানে উৎসব ও প্রাপ্তির পূর্ণতায় ভরা, সেখানে রোনালদোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ঘিরে এখন তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। পুলিশি হয়রানি বন্ধের দাবিতে প্রেসক্লাবের সামনে ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের অবরোধ। তার আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ এখনো ঝুলে আছে অনিশ্চয়তায়। অর্থাৎ ঘটনাটিকে এখনই তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
বুয়েনস এইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্তালে বেনিনের বিপক্ষে মঙ্গলবার আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামবেন ৩৯ বছর বয়সী মেসি। প্রায় ৮৫ হাজার দর্শক সাক্ষী হতে যাচ্ছেন এই মহাতারকার বিদায়ের। যে দেশটি একসময় তার কাছে কেবল শিরোপা আশা করত, সেই দেশকেই তিনি দুটি কোপা আমেরিকা, একটি বিশ্বকাপ ও ফিনালিসিমা উপহার দিয়ে ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে পৌঁছেছেন। আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল ও ৬৮ অ্যাসিস্ট করা মেসির অর্জনের ঝুলি এখন পরিপূর্ণ।
অন্যদিকে রোনালদোর বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা অগোছালো। ৪১ বছর বয়সী এই পর্তুগিজ তারকা নরওয়ের বিপক্ষে নেশন্স লিগের ম্যাচে বেঞ্চে ছিলেন। এরপর ডেনমার্কের বিপক্ষে একাদশে জায়গা না পাওয়ার বিষয়টি জানার পর তিনি দলের ক্যাম্প ছেড়ে চলে যান। তিনি এখনো অবসরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেননি এবং কোচ জর্জ জেসুসও জানিয়েছেন, রোনালদো চাইলে জাতীয় দলে ফিরতে পারেন। চিকিৎসায় নোবেল ঘোষণা আজ, আলোচনায় যেসব গবেষণা। পরে জানিয়েছেন, সময়মতো নিজের সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করবেন।
কোচ জর্জ জেসুসের মতে, রোনালদোর অতীত অর্জন বা নামের চেয়ে দলের বর্তমান প্রয়োজন ও একাদশ গঠন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নরওয়ের ম্যাচের আগেও স্পষ্ট করেছিলেন যে রোনালদো বদলি হিসেবে খেলবেন কি না তা দলের কৌশলের ওপর নির্ভর করবে। ৪১ বছর বয়সী রোনালদোর ফিটনেস ও গোল করার সামর্থ্য এখনও অটুট থাকলেও পর্তুগাল দলের একাদশে তার ভূমিকা নিয়ে কোচ ও তার মধ্যে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে, যা ক্যাম্প ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে। ম্যাচের একপর্যায়ে রোনালদোকে নামানোর কথাও ভেবেছিলেন জেসুস।
মেসির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি মেসির ভূমিকা এমনভাবে বিবর্তিত করেছেন যাতে তার ক্যারিয়ারের শেষ সময়টি কোনো অবমূল্যায়ন ছাড়াই আর্জেন্টিনা দলের সোনালি সময় হয়ে ওঠে। ২০২১ কোপা আমেরিকা থেকে শুরু করে ২০২২ বিশ্বকাপ পর্যন্ত প্রতিটি শিরোপাই মেসির সেই অভিযানের সফলতার প্রতিফলন। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের ব্যর্থতা, সমালোচনা ও অবসরের ঘোষণার ঝড় পেরিয়ে মেসি এখন পূর্ণতার চূড়ায়।
রোনালদোকে ঘিরে পর্তুগাল যে বাস্তবতার মুখোমুখি, তা অনেকটা জটিল। বছরের পর বছর দলের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই তারকাকে ছাড়া পর্তুগাল কেমন করবে, তা নিয়েই এখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। তিনি নভেম্বরে দলে ফিরে আবারো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন, অথবা আজকের এই অস্বস্তিকর ঘটনাটি তার শেষ অধ্যায়ের একটি অংশ হয়েই থাকতে পারে।
বর্তমানে ফুটবল বিশ্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখে—একজন কিংবদন্তি খেলোয়াড় যখন আর আগের মতো দলের অপরিহার্য অংশ থাকেন না, তখন তাকে কীভাবে সম্মানজনক বিদায় জানানো যায়? আর্জেন্টিনা মেসিকে ঘিরে যে ঐক্যের পরিবেশ তৈরি করেছে, পর্তুগাল এখন রোনালদোর ভূমিকা বদলে ঠিক সেই উত্তরটিই খুঁজছে। মেসির বিদায় যেখানে একটি সমাপ্ত গল্প, সেখানে রোনালদোর অধ্যায়টি এখনো আলোচনার দাবি রাখে। তাকে ঘিরে থাকছে আবেগঘন বিদায়ী আয়োজন। তবে পর্তুগালের সামনে বড় প্রশ্নটা ইতিমধ্যেই উঠে গেছে, দেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় যখন আর নিশ্চিত একাদশের সদস্য নন, তখন তার ভূমিকা কী হবে।