ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে দেশটির বিরোধী রাজনৈতিক জোট এবং তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ তীব্র আন্দোলনে নেমেছে। বিশেষ করে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগে এই উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। আন্দোলনের মুখে বর্তমানে তরুণদের মধ্যে বহুল আলোচিত স্লোগান হয়ে উঠেছে ‘জ্ঞানেশ, ইটস ডান ব্রো’ (অর্থাৎ, জ্ঞানেশ, তোমার খেলা শেষ ভাই)। এই স্লোগানটি এখন কেবল তরুণদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং বিরোধী দলগুলোর বিভিন্ন কর্মসূচিতেও এটি ব্যবহৃত হচ্ছে। ভারতের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে এ ধরনের জনরোষকে বিরল ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই অভিযোগের পর থেকেই জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বিরোধী দলগুলো। স্লোগানটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
বিতর্কটির মূল সূত্রপাত হয়েছে গত ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে। সেখানে অভিযোগ তোলা হয় যে, তিন সদস্যবিশিষ্ট নির্বাচন কমিশনের অন্য দুই কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশীর আপত্তি সত্ত্বেও জ্ঞানেশ কুমার ভোটার তালিকা সংশোধন সংক্রান্ত কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। বিরোধীদের অভিযোগ, কমিশন যেসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া যথাযথভাবে মানা হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের তিন সদস্য সমমর্যাদায় মতবিনিময়ের পর সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা সর্বসম্মতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেন।
এই ইস্যুতে গত ৬ অক্টোবর থেকে দিল্লিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন রাহুল গান্ধীসহ বিরোধী দলের শীর্ষ নেতারা। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করে যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার পথে পুলিশ রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ বেশ কয়েকজন নেতাকে আটকও করেছে। যদিও পরবর্তী সময়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। কংগ্রেসসহ বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের নেতারা বলছেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে ইচ্ছাকৃতভাবে যোগ্য ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে, যার জবাবদিহি কমিশনকে দিতে হবে। পরদিন ৭ অক্টোবরও রাহুল গান্ধীসহ বিরোধী নেতারা যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার সময় আটক হন।
বুধবার দিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে বামপন্থি ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সর্বভারতীয় সভাপতি নেহা বোরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ১৩ কোটি মানুষের ভোটাধিকার রক্ষা করা এখন দেশের সবচেয়ে গুরুতর ইস্যু। এর আগে ২ অক্টোবর মুম্বাইয়ের এক সমাবেশে সিজেপির নেতা অভিজিৎ দীপকের উপস্থিতিতে তরুণদের ঢল নামে। সেখানে তিনি নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী এক গরিব মায়ের সন্তান হওয়ার যে পরিচয় দেন, তার নীতিতে আজ ভারতের সব সন্তানই সেই সংকটে পড়ে গেছে। ২ অক্টোবর মুম্বাইয়ে সিজেপির সমাবেশে বিপুল মানুষের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে মানুষের দাবির বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে ২ অক্টোবর মুম্বাইয়ের একটি সমাবেশের পর। জুলাইয়ে সর্বভারতীয় ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষা নিটে কথিত অনিয়মের প্রতিবাদে আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন।
এদিকে নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের ভাষ্যমতে, বিক্ষোভরত সাংসদদের স্মারকলিপি নেওয়ার জন্য তারা একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু বিক্ষোভকারীরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের দাবিতে অনড় ছিলেন। বিজেপির নেতা সুধাংশু ত্রিবেদী বিরোধীদের এই অবস্থানকে সমালোচনা করে বলেছেন, নির্বাচন কমিশনারকে সরাসরি তলব করা সংবিধানবিরোধী এবং বিরোধীরা আদতে আলোচনায় আগ্রহী কি না তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ নিয়েও বর্তমানে দেশটিতে আইনি বিতর্ক তুঙ্গে রয়েছে। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ কমিশনার নিয়োগে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা ও প্রধান বিচারপতির সমন্বয়ে একটি প্যানেল গঠনের সুপারিশ করেছিল। তবে পরবর্তীতে সংসদীয় আইনে পরিবর্তন এনে নিয়োগ কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী ও একজন মন্ত্রীর পাশাপাশি বিরোধী দলের প্রতিনিধি রাখা হয়। বিরোধীদের দাবি, কমিটিতে সরকারের প্রতিনিধিত্ব দুইজন হওয়ায় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারের একচেটিয়া প্রভাব নিশ্চিত হয়েছে। সাবেক আমলা জহর সরকার বলেন, ২৫ বছর বয়সি একজন তরুণ ১২ বছর বয়স থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি শুনে বড় হয়েছে।
ভোটার তালিকার ফর্ম-৬ এর পরিবর্তন নিয়েও দেখা দিয়েছে জটিলতা। ২৬ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন এক প্রেস নোটে দাবি করেছিল যে, ফর্ম-৬ এর সঙ্গে যুক্ত ঘোষণাপত্রটি সুপ্রিম কোর্ট বহাল রেখেছে। কিন্তু ৫ অক্টোবর প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ওই সংশোধিত ফর্মটি সুপ্রিম কোর্ট অনুমোদনই করেনি। ফলে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের এই আন্দোলনের চরিত্র ভিন্ন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরতি জেরথের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এখন অনেক তরুণই এমন পরিবারের সন্তান যারা অতীতে বিজেপিকে সমর্থন করেছে। কিন্তু শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও বেকারত্বের সংকট এখন তাদের জীবনের সরাসরি সমস্যায় পরিণত হওয়ায় তারা রাজপথে নেমেছে। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সঞ্জীব শ্রীবাস্তব মনে করেন, ভারতের তরুণদের মধ্যে আগের চেয়ে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিবাদ করার সাহস বহুগুণ বেড়েছে। এছাড়া আন্দোলনে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ সরকারের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে।
এর আগে নিট পরীক্ষার অনিয়মের ঘটনায় তরুণদের আন্দোলনের জেরে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই নির্বাচন কমিশন নিয়ে নতুন এই বিতর্কে তরুণ সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ সরকারবিরোধী ক্ষোভকে আরও উসকে দিচ্ছে। নেহা বোরার মতে, বিভাজনের রাজনীতির কারণে দেশের প্রকৃত ইস্যুগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, যা থেকে বেরিয়ে আসার জন্যই তরুণরা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার নতুন ধারা তৈরি করছে।