যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সরাসরি অনুরোধে গ্রিসে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত কিম্বারলি গিলফয়েল তার দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন। মূলত এক রাজনৈতিক অনুদানদাতার কাছ থেকে নিজের ক্রেডিট কার্ডের ১ লাখ ডলারের বকেয়া বিল পরিশোধের জন্য অর্থ চাওয়া এবং এর বিনিময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠার পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অভিযোগটি সামনে আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি হয় এবং আইনপ্রণেতারাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি কেটি জ্যাকারিয়া নিশ্চিত করেছেন যে, প্রশাসনের নির্দেশেই কিম্বারলিকে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছিল। তিনি জানান, কিম্বারলি প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এবং তাকে শুভকামনা জানানো হয়েছে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, গিলফয়েলের কাজে প্রশাসন সন্তুষ্ট ছিল না এবং তার সম্পর্কে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো গুরুত্বের সাথে দেখা হয়েছে। সোমবার ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে তাকে বরখাস্ত করার কথা ভাবা হচ্ছে।
অভিযোগকারী মার্কিন ব্যবসায়ী ও ট্রাম্পের সমর্থক এরিক ডিটার্স দাবি করেছেন, কিম্বারলি তার কাছে ১ লাখ ডলার দাবি করেছিলেন। এই অর্থ দিয়ে তিনি তার আমেরিকান এক্সপ্রেস ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধের পরিকল্পনা করেছিলেন এবং ডিটার্সকে ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগের সুযোগ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ডিটার্স এটিকে সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে অর্থের বিনিময়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা বলে অভিহিত করেছেন।
অন্যদিকে, কিম্বারলি গিলফয়েলের আইনজীবীরা এই অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, ডিটার্সের কাছে পাওনা অর্থ রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনীত হওয়ার পূর্বের কোনো কাজ বা পরামর্শমূলক সেবার পারিশ্রমিক ছিল। অভিযোগের বিষয়ে কিম্বারলি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বিবৃতিতে জানান, রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তার জন্য অত্যন্ত সম্মানের। তিনি এসব অভিযোগকে মিথ্যা বলে দাবি করেছেন এবং নিজের সুনাম রক্ষায় লড়াই করার ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে অভিযোগগুলো এখনো প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার সুযোগ নেই।
শুধু এই ঘটনা নয়, কিম্বারলির বিরুদ্ধে আরও বেশ কিছু অভিযোগ সামনে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে অনৈতিকভাবে উপহার গ্রহণ, বিভিন্ন সুবিধা নেওয়া, গ্রিসের এক কর্মকর্তাকে হুমকি প্রদান এবং রাষ্ট্রদূত থাকাকালীন একটি গ্রিক জ্বালানি কোম্পানির পক্ষে পক্ষপাতিত্ব করা। অভিযোগ রয়েছে যে, ওই কোম্পানির লবিস্টের সাথে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। এছাড়া বিলাসবহুল ব্যক্তিগত বিমানে ভ্রমণ ও আতিথেয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তার আইনজীবীরা এসব অভিযোগের জবাবে জানিয়েছেন, কিম্বারলি পররাষ্ট্র দপ্তরের নির্ধারিত নিয়ম ও বিধিমালা মেনে ভ্রমণ এবং উপহার গ্রহণের কাজ সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ইন্সপেক্টর জেনারেলের কার্যালয় তার কার্যক্রম পর্যালোচনা করছে, তবে তদন্তের সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্র বা অগ্রগতি এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
কিম্বারলি ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত। তিনি ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের সাবেক বাগদত্তা। আইন পেশা ও টেলিভিশন মিডিয়া ছেড়ে ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্পের পক্ষে সক্রিয় ছিলেন তিনি। ২০২৫ সালে তিনি গ্রিসে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পান। গ্রিসে দায়িত্ব পালনকালে তিনি জ্বালানি সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বন্দর পিরেয়াসে চীনের বিনিয়োগের বিরোধিতা করে আলোচনায় ছিলেন। তার নিয়োগ ও এথেন্সে কর্মকাণ্ড শুরু থেকেই আলোচনায় ছিল।
কিম্বারলি স্পষ্ট করেছেন যে, পদত্যাগ করলেও ট্রাম্প, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ কর্মসূচির প্রতি তার সমর্থন অব্যাহত থাকবে। এদিকে গ্রিসের বিরোধী দল পাসোকের পররাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র দিমিত্রিস মানজোস জানিয়েছেন, এই ঘটনায় অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। কিম্বারলির পদত্যাগের মাধ্যমে গ্রিসে তার কূটনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও তার বিরুদ্ধে ওঠা আইনি অভিযোগগুলোর ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও রয়টার্স।