ফ্রান্স ও ইতালিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির সংকট এবং সরকারি ব্যয় কমানোর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। একপর্যায়ে সরকারি খাতের কর্মীরাও বিক্ষোভে যোগ দেন।
এসব কর্মসূচিতে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মতো সহিংস ঘটনা ঘটায় দুই দেশের সরকারই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এসব কর্মসূচির অনেকগুলোই পরে দাঙ্গা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে রূপ নেয়।
বিশেষ করে তরুণ ও কিশোর বয়সীদের এমন কর্মকাণ্ডে অভিভাবকদের আর্থিক দায়বদ্ধতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইতালিতে ইতোমধ্যে এই সংক্রান্ত নতুন পদক্ষেপ অনুমোদন করা হয়েছে এবং ফ্রান্সেও আগামী ২৭ অক্টোবর একটি খসড়া আইন নিয়ে আলোচনার দিন ধার্য করা হয়েছে।
ফ্রান্সে গত মাসে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরুর পর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। সেখানে অনেক অভিভাবককে তাদের সন্তানদের জোর করে বিক্ষোভস্থল থেকে সরিয়ে নিতে দেখা যায়। সন্তানদের অপরাধের দায়ভার ও জরিমানা গুনতে হওয়ার আশঙ্কায় অভিভাবকদের এমন তৎপরতা বলে ধারণা করা হচ্ছে। মূলত বিদ্যালয় ভবনগুলোর বেহাল দশা, শিক্ষক সংকট এবং সরকারি বাজেটে ব্যয় হ্রাসের পরিকল্পনার প্রতিবাদে প্যারিসের সেইন-সাঁ-দেনিতে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলনের সূচনা করেন। বিদ্যালয়ের ভবনগুলোর বেহাল অবস্থা ও শিক্ষকের ঘাটতি ছিল তাদের ক্ষোভের অন্যতম কারণ।
পর্যায়ক্রমে এই বিক্ষোভ ফ্রান্সের অন্যান্য শহরে ছড়িয়ে পড়ে এবং শত শত বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীকালে সরকারি কর্মীরা বেতন স্থগিতের প্রতিবাদে এবং সাধারণ মানুষ জ্বালানি সংকট ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ক্ষোভে আন্দোলনে শামিল হন। ইতালির মিলান, বোলোনিয়া ও তুরিন শহরেও তরুণদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ সহিংস আকার ধারণ করে। মিলানের বিক্ষোভ এক পর্যায়ে দাঙ্গায় রূপ নিলে মুখোশধারী তরুণরা পুলিশের ওপর পাথর নিক্ষেপ করে এবং বিভিন্ন দোকানে লুটপাট ও ব্যারিকেডে আগুন ধরিয়ে দেয়। মুখোশ পরা বিক্ষোভকারীরা দাঙ্গা পুলিশের দিকে পাথর, রাস্তার পাথরের টুকরা ও অন্যান্য বস্তু ছুড়ে মারেন।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ গত সপ্তাহে জানিয়েছেন, সহিংসতার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই এবং প্রয়োজনে কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট এলাকায় জনসমাবেশ নিষিদ্ধ বা কারফিউ জারি করতে পারে। অন্যদিকে, বিক্ষোভকারীদের পক্ষ থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বল প্রয়োগের অভিযোগও তোলা হয়েছে। গত শনিবার ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, বেলজিয়াম ও পর্তুগালে কয়েক লাখ মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিচ্ছিন্নভাবে রাস্তায় নামেন। কোনো অপরাধ না করলেও তাদের আটক করা যেতে পারে, যদি তাদের বিপজ্জনক হওয়ার বিষয়ে প্রমাণ থাকে।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার সহিংসতা মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মিলানে বছরের শেষ পর্যন্ত ৫০০ সেনা মোতায়েন এবং কিশোর বিক্ষোভকারীদের জন্য প্রশাসনিক আটকের বিধান। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো জনসমাবেশে জননিরাপত্তা বিপন্ন করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও ২০ হাজার ইউরো পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। মার্কিন ডলারে এই জরিমানার পরিমাণ প্রায় ২২ হাজার ৪৬০ ডলার। ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সি বিক্ষোভকারীদের ক্ষেত্রেও প্রশাসনিকভাবে আটক রাখার বিধান রাখা হয়েছে।
ইতালির বিদ্যমান দেওয়ানি আইনের ২০৪৮ ধারা অনুযায়ী, অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের বেআইনি কাজের জন্য মা-বাবা বা আইনি অভিভাবক দায়ী থাকেন। এখন নতুন ডিক্রির আওতায় এই আইন আরও কঠোর করা হচ্ছে। এতে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সরাসরি অভিভাবকদের জরিমানা করার ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। প্রয়োজনবোধে সরকার অভিভাবকদের সম্পত্তি জব্দ করা, বেতন থেকে টাকা কাটা কিংবা সরকারি ভর্তুকি থেকে অর্থ আদায়ের সুযোগ পাবে। ইতালির দেওয়ানি আইনের ২০৪৮ ধারায় আগে থেকেই বলা আছে, যেসব অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান আইনগতভাবে স্বাধীন নয় এবং অভিভাবকের সঙ্গে বসবাস করে, তাদের বেআইনি কাজের কারণে ক্ষতি হলে মা-বাবা ও অভিভাবকেরা তার দায় বহন করবেন। আগে এ ধরনের ক্ষমতা শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল।
ফ্রান্সের দেওয়ানি আইনের ১২৪২ ধারা অনুসারে, অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডের জন্য মা-বাবা যৌথভাবে দায়ী থাকেন। গত বছর এই আইন সংশোধন করে মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের বসবাসের শর্তটি তুলে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দায়বদ্ধতার বিমার মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ থাকলেও, তা চুক্তির শর্তের ওপর নির্ভর করে। তবে এবার সরকার ‘দাঙ্গাকারীরা ক্ষতিপূরণ দেবে’—এমন একটি নতুন খসড়া আইন নিয়ে কাজ করছে যা ২৭ অক্টোবর আলোচিত হবে।
প্রস্তাবিত এই আইন পাস হলে ভাঙচুরের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ ১০ হাজার ইউরো (প্রায় ১১ হাজার ২০০ ডলার) ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁন লেকর্নু এই আইনকে ‘একেবারেই অপরিহার্য’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, বিক্ষোভের কারণে সরকারি সম্পদ বা ব্যক্তিগত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়, তার দায়ভার যেন করদাতাদের ওপর না পড়ে, তা নিশ্চিত করাই এই আইনের লক্ষ্য। একই সঙ্গে সরকারের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়েও তারা অসন্তুষ্ট ছিলেন।
নতুন এই খসড়ায় ‘দলগত দেওয়ানি দায়বদ্ধতার’ বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। এর ফলে কোনো দলের সদস্যরা ভাঙচুর করলে, সরাসরি হামলায় জড়িত না থাকলেও ওই দলের অন্য সদস্যদেরও আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে। সুইডেনেও শিশু অপরাধের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত অভিভাবকের দায়বদ্ধতার বিধান রয়েছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রেও অঙ্গরাজ্যভেদে আইন রয়েছে, যার আওতায় অপ্রাপ্তবয়স্করা সরকারি বা ব্যক্তিগত সম্পদ নষ্ট করলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা স্থানীয় সরকার অভিভাবকদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে।