গাজা যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, ইরানের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাত, উত্তরাঞ্চলে নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে সৃষ্টি হওয়া বিতর্ক—সব মিলিয়ে বহুমুখী সংকটে পড়েছে ইসরাইল। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়েছে সামরিক ব্যয়ের বিশাল চাপ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দেশটির সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে তৈরি হওয়া গভীর মেরুকরণ। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলি সমাজ ও রাজনীতির রাজনৈতিক বিভাজন তুলে ধরে অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনার কথা সতর্কভাবে জানিয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আরো বাড়তে পারে, এমনকি অভ্যন্তরীণ সংঘাতের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তাই শুধু ঋণ বৃদ্ধির পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে দেশটির অর্থনৈতিক পতন আসন্ন বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। অন্যদিকে, ইরানও এই সংঘাতে প্রাণহানি, অর্থনৈতিক ক্ষতি ও অবকাঠামোগত বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
ইসরাইলের বর্তমান সংকটের অন্যতম প্রধান দিক হলো দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিগুলোর মধ্যে গভীর মতপার্থক্য। রাষ্ট্র পরিচালনার ধরন, নিরাপত্তানীতি এবং অধিকৃত ভূখণ্ড ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন করে আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে টানাপোড়েন পরিস্থিতিকে অস্থির করে তুলেছে। এর পাশাপাশি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের আকস্মিক হামলা ঠেকাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের ভূমিকা নিয়েও কঠোর সমালোচনা রয়েছে।
ইসরাইলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের (আইএনএসএস) ২০২৬ সালের জুনের এক প্রতিবেদনে প্রকাশ পায় যে, জরিপে অংশ নেওয়া সাধারণ ব্যক্তিদের মাত্র ২৫ শতাংশ সরকারের ওপর উচ্চমাত্রার আস্থা প্রকাশ করেছেন। এর বিপরীতে, ৭৩ শতাংশ উত্তরদাতা সরকারের প্রতি নিম্নপর্যায়ের আস্থা প্রকাশ করেন। আলাদাভাবে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর প্রতি উচ্চ আস্থা প্রকাশ করেছেন ৩১ শতাংশ উত্তরদাতা, আর ৬৭ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন যে তার প্রতি তাদের আস্থা বেশ কম।
জরিপের এই চিত্র সরকার ও সমাজের একটি বড় অংশের মধ্যে বিরাজমান আস্থার ঘাটতির স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। তবে এসব পরিসংখ্যানকে এককভাবে সরকারের নিশ্চিত পতন কিংবা রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়ার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। নির্বাচনের ফলাফল, সংসদে নতুন জোট গঠন এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর কৌশলগত অবস্থানও ভবিষ্যতের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। গাদি আইজেনকটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ধারাসহ নেতানিয়াহুর বিরোধীদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি দেশের কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণেও প্রভাব ফেলছে। সংকটগুলো একসঙ্গে বাড়লে কী হতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাত ইসরাইলের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর তীব্র ও মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছে। ইসরাইলের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের আর্থিক ব্যয় ২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩৫০ বিলিয়ন শেকেল বলে অনুমান করা হয়েছে। তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানের সঙ্গে সম্পর্কিত নতুন সিদ্ধান্ত ও বাড়তি ব্যয় এই বিশেষ হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে হামাস, হিজবুল্লাহ ও ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের কিছু সামরিক সাফল্যের কথাও উল্লেখ করেছিল সংস্থাটি।
একইভাবে, ২০২৩ সালের শুরুতে ইসরাইলের সরকারি ঋণ ও মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাত ছিল প্রায় ৬০ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে দাঁড়ায় ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশে। ইসরাইলি কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিপুল সামরিক ব্যয়, যুদ্ধের কারণে বেসামরিক খাতে অতিরিক্ত সরকারি খরচ এবং ঋণের মাধ্যমে এসব মেটানোকে দেশের আর্থিক অবস্থার ওপর অভূতপূর্ব চাপ সৃষ্টির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
জাতীয় ঋণের বোঝা অনবরত বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে দেশের অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের মতো জনকল্যাণমূলক খাতে বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। স্বাভাবিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিছু ক্ষেত্রে বজায় থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের কারণে সরকারের স্বাধীন আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যাওয়ার বড় ঝুঁকি রয়েছে। তবে ইসরায়েলের অর্থনীতিতে পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতাও রয়েছে।
গাজায় দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযান ইসরাইলের ঘোষিত প্রধান কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের সক্ষমতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি করেছে। টানা ও ব্যাপক হামলায় ফিলিস্তিনিদের বিপুল প্রাণহানির পাশাপাশি গাজার বেসামরিক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে সামরিক অভিযান মূলত কতটা সফল হয়েছে, তা শুধু ভৌত ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। গাজার ভবিষ্যৎ বেসামরিক প্রশাসন, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আটক বন্দি ও জিম্মিদের ফিরিয়ে আনার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো এখনো নেতানিয়াহু সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
২০২৫ সালের আগস্টে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) এক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, সামরিক সাফল্যকে দীর্ঘস্থায়ী ও অর্থবহ রাজনৈতিক ফলাফলে রূপ দিতে নেতানিয়াহু সরকারের সামনে অতি কঠিন বাধা রয়েছে। পাশাপাশি দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারেনি। সংঘাতের কারণে ঘরবাড়ি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হওয়া বাসিন্দাদের নিরাপদে প্রত্যাবর্তন এবং ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুদ্ধার সরকারের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৬ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত কিরিয়াত শমোনা এলাকার পরিস্থিতি সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিবেদনে গভীর নিরাপত্তা উদ্বেগ, স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিশাল ক্ষতি এবং বাস্তুচ্যুত বাসিন্দাদের একাংশের তীব্র অসন্তোষের কথা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে, কেবল সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রতিপক্ষকে সাময়িকভাবে দুর্বল করা গেলেও বেসামরিক নাগরিকদের জন্য স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনা সম্পূর্ণ আলাদা চ্যালেঞ্জ।
২০২৬ সালে ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ ইসরাইলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর তেহরানের পাল্টা আক্রমণে সংঘাতের পরিধি দ্রুত বিস্তৃত হয়। এর তীব্র প্রভাব শুধু ইসরাইল ও ইরানের ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; আঞ্চলিক পরিকাঠামো, মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং কৌশলগত লোহিত সাগরের বাণিজ্যিক নৌপরিবহনও বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের (সিআরএস) ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে সংঘাতের এই বিস্তৃত প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপ্রিলে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এবং জুনে একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও তা স্থায়ী চুক্তির পথ তৈরি করতে পারেনি, যার ফলে পরবর্তী সময়ে আবারো সংঘাত নতুন রূপ নেয়। এই ঘটনা প্রমাণ করেছে যে, কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হলেও, সেই চাপকে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও টেকসই নিরাপত্তা সমঝোতায় রূপান্তর করা একটি জটিল কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। ফলে উভয় পক্ষের ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় না নিয়ে সংঘাতের সামগ্রিক মূল্যায়ন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।