রাজধানীর উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাট সংলগ্ন তুরাগ নদী থেকে বুধবার বিকেলে বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির মরদেহ উদ্ধার করেছে নৌ পুলিশ। ২৮ বছর বয়সী তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার একদিন পর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ পাওয়া সংবাদের ভিত্তিতে তার দেহটি খুঁজে পাওয়া যায়। পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, উদ্ধারকৃত ওই ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত শুরু হয়েছে। অভ্যুত্থানের পর চাকরি থেকে অব্যাহতি নেন তাহসিফ সৌরি। বিকাল সাড়ে ৪ টার দিকে তুরাগ নদী থেকে একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। যার বয়স আনুমানিক ২৮ বছর।
নিহত তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের পর বিভিন্ন মহলে নানা প্রশ্ন ও রহস্য দানা বেঁধেছে। তার বাবার ভাষ্যমতে, যে এলাকায় মরদেহ পাওয়া গেছে, তাহসিফ সেখানে আগে কখনো যাননি। নিখোঁজের সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হওয়ার সময় তিনি পরিবারের কাউকে কিছু না জানিয়ে বেরিয়েছিলেন। নিহতের সঙ্গে থাকা আইফোন ও হাতঘড়ি অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেলেও মৃত্যুর আগের শেষ সময়গুলোতে তিনি কোথায় ছিলেন বা কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না। ইতিমধ্যে তার মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষ হয়েছে। রাত দেড়টা পর্যন্ত কোথায় ছিলেন, শেষ মেসেজ কে দিয়েছিল, কোন বিষয় নিয়ে তিনি আতঙ্কিত ছিলেন—এমনটাও আলোচনায় আসছে।
সাবেক এই কর্মকর্তার মৃত্যুর সঙ্গে রাজনৈতিক যোগসূত্র থাকার দাবিও সামনে আসছে। গত ৫ আগস্টের পর শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময়কার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে সেটি ধারণের অভিযোগে তাহসিফের নাম আলোচনায় আসে। তবে সম্প্রতি একটি পডকাস্টে তিনি নিজেই এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেই পডকাস্টে তিনি জানিয়েছিলেন, বিমানবাহিনী থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পেছনে ওই ঘটনার সম্পর্ক থাকতে পারে বলে তার সন্দেহ রয়েছে। ৫ আগস্টের পর থেকে নানান বিষয়ে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা হলেও তার বিরুদ্ধে কোনো আইনি মামলা দায়ের করা হয়নি বলেও তিনি দাবি করেছিলেন। কে তাকে ডেকে নিল এমন প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে। আলোচনা আছে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উড়োজাহাজে করে ভারতে পালানোর ভিডিও প্রচার করেছিলেন। মৃত্যুর বেশ কদিন আগে প্রকাশিত একটি পডকাস্টে তাহসিফ নিজেই অভিযোগটিকে ‘প্রমাণহীন অভিযোগ’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি আরো লেখেন, ৫ই আগস্টের ভিডিও ফাঁস হওয়ার পর, তার মানহানি করা হয় নানান বিষয়ে কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনো পুলিশি কেস করতে পারেনাই।
তাহসিফের পরিচিত ও বন্ধু বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কর্মকর্তা কে এস এম ইনতিসার ইনজামাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, লাশের ছবি দেখে মনে হচ্ছে হাতে কাদা মাখা, যা স্বাভাবিক পরিস্থিতির বাইরে। কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা বা দুর্ঘটনা প্রমাণিত না হলে তিনি এই মৃত্যুতে রাজনৈতিক ইন্ধন থাকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। এদিকে, নিজেকে তাহসিফের বন্ধু দাবি করা বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে কর্মরত কে এস এম ইনতিসার ইনজামামও নিজের ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন। তিনি লেখেন, গত পরশু রাতে সে বাইরে যায় এরপর এই ঘটনা। বাকি সব ক্লিন, এইটা কিসের লক্ষণ আমি এখনি বলতে চাইনা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ঘটনার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। নৌ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে তুরাগ নদীতে অজ্ঞাতনামা হিসেবে মরদেহটি ভাসতে দেখা যায়। পরনে সাদা পাজামা ও কালো পাঞ্জাবি পরিহিত ওই যুবকের পরিচয় তার সঙ্গে থাকা মোবাইলের সূত্র ধরে নিশ্চিত করা হয়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে আসার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।