শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০১:১১ অপরাহ্ন
শিরোনাম
ধ্বংসস্তূপে গাজার বাসিন্দাদের টিকে থাকার লড়াই ও একে অপরকে সান্ত্বনা বরিশাল বোর্ডে এইচএসসির পাশের হার ৪৪.৮৪ শতাংশ, ব্যর্থ ১১ প্রতিষ্ঠান জাপান সফরে ৬৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ সম্ভাবনা: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এইচএসসিতে পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ, ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ইউক্রেনকে ৫০০ প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র দেবে যুক্তরাষ্ট্র তদন্তের শুরুতেই সামনে যেসব: তাহসিফের মৃত্যুরহস্য ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত নিরসনে ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত পাকিস্তানের ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ দামে পৌঁছেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বিচার বিভাগের বড় চ্যালেঞ্জ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বাকেরগঞ্জে গৃহবধূকে নিপীড়নের অভিযোগ, থানায় মামলা না নেওয়ার দাবি

তদন্তের শুরুতেই সামনে যেসব: তাহসিফের মৃত্যুরহস্য

Reporter Name / ৬ Time View
Update : শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির (২৮) রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত জোরদার করেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা।

উত্তরার বাসা থেকে বন্ধুর সঙ্গে বের হওয়ার পর কীভাবে তিনি তুরাগ নদের নির্জন এলাকায় পৌঁছালেন এবং পরবর্তীতে তার প্রাণহানি ঘটলো, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। ঘটনাটির মূল তদন্ত নৌপুলিশ পরিচালনা করলেও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করে ছায়াতদন্তে নেমেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তের অংশ হিসেবে তাহসিফের সঙ্গে শেষবার দেখা যাওয়া বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এরপর উত্তরার একটি রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে রাতের খাবার খান। দুজনের গতিবিধি, কোথায় কতক্ষণ ছিলেন এবং রাতের কোন সময়ে কোন এলাকায় পৌঁছেছিলেন, তা প্রযুক্তির সহায়তায় যাচাই করা হচ্ছে। তিনি জানান, নৌপুলিশের পাশাপাশি পিবিআই ঘটনাটি নিয়ে কাজ করছে।

পিবিআই ও স্থানীয় থানা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, দীপের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) ঘটনাস্থল ও এর আশপাশের কয়েকটি এলাকায় সরেজমিনে পরিদর্শনে যান তদন্তকারীরা। তল্লাশি চালিয়ে টঙ্গী এলাকা থেকে একটি নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। তবে বিস্তারিত ফরেনসিক ও সুরতহাল পর্যালোচনার আগে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে এখনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি পুলিশ। তদন্তকারীরা জানান, দীপ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে যেসব দাবি করেছেন, তার অনেকগুলোর সঙ্গেই প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান ও সিসিটিভি ফুটেজের অমিল পরিলক্ষিত হচ্ছে। শুক্রবার দুপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘হাস্যকর বক্তব্য না। একজন ডিফেন্স অফিসার পুলিশের ধাওয়ায় দৌড় দেবে; এটা হাস্যকর বক্তব্য না। পিবিআই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি দুর্ঘটনা নাকি হত্যাকাণ্ড—কোনো সম্ভাবনাই এখনই বাদ দেওয়া যাচ্ছে না।

ঘটনার বিবরণ ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় উত্তরার বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। বের হওয়ার সময় তিনি পরিবারকে জানান, দীপ নামে পরিচিত এক ছোট ভাই নিচে অপেক্ষা করছেন এবং তার সঙ্গে কথা বলেই তিনি দ্রুত ফিরে আসবেন। ভবনের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ওই দিন সন্ধ্যা ৬টা ২৪ মিনিটের দিকে দীপ তাদের বাসার গ্যারেজে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে সন্ধ্যা ৬টা ৩১ মিনিটে দুজনকে আলাদা দুটি মোটরসাইকেলে চড়ে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। তবে এরপরের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে দীপের বক্তব্যে বারবার পরিবর্তন এসেছে। তাহসিফ ও দীপের শেষ যাত্রার প্রকৃত গন্তব্য কোথায় ছিল। এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই জানা যাবে ২৭ অক্টোবর রাতে আসলে কী ঘটেছিল। এ ধরনের ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটন না হলে মানুষের মধ্যে নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।

প্রাথমিক সাক্ষাৎকারে দীপ দাবি করেছিলেন, তাহসিফের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি নষ্ট থাকায় সেটি মেরামতের উদ্দেশ্যে তিনি গ্যারেজে গিয়েছিলেন এবং দুজনে মিলে চালুর চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে ওয়ার্কশপে নিয়ে এটি মেরামত শেষে রাত ১২টার দিকে তারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। বাসায় ফিরে তাহসিফকে ফোনে না পেয়ে তার মোবাইল বন্ধ পাওয়ার কথা জানান দীপ। কিন্তু পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি পরবর্তীতে ভিন্ন তথ্য দিয়ে জানান, তারা রাতে রাজাবাড়ী ঘাট ও টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন এবং সেখানে অবস্থান করেছিলেন।

পিবিআই কর্তারা জানান, দীপের সাম্প্রতিক তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে রাজাবাড়ী ঘাট ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেন, তুরাগ নদসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানকালে পুলিশি পোশাক পরা দুই ব্যক্তিকে দেখে তারা ভয়ে দৌড় দেন। দীপের দাবি অনুযায়ী, সেই তাড়াহুড়োর মধ্যেই তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। তবে এ তথ্যকে সম্পূর্ণ অবাস্তব ও ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। তিনি উল্লেখ করেন, তার ছেলে একজন দক্ষ সাঁতারু ছিলেন এবং কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া তার এভাবে নদে ঝাঁপ দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ওই অঞ্চলে সে কখনোই গিয়েছে বলে আমি মনে করি না।

ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহাও দীপের বক্তব্যের অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, ধাওয়ার ঘটনা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তবে ধাওয়াকারীদের পরিচয় নিশ্চিত করার মতো কোনো সিসিটিভি ফুটেজ বা প্রত্যক্ষদর্শী প্রমাণ রয়েছে কি না তা দেখা জরুরি। এছাড়া দীপ যদি তাহসিফকে পানিতে ঝাঁপ দিতে দেখে থাকেন, তবে প্রথম প্রদত্ত বক্তব্যে কেন সে কথা লুকিয়ে রাখা হলো—তা একটি গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসার বিষয়। একজন মানুষ কেন হুট করে নদীতে নামবেন, সেই বিষয়েও নিখুঁত তদন্ত আবশ্যক। তার প্রশ্ন, ধাওয়ার ঘটনা সত্য হলে ধাওয়াকারীরা কারা।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট অপর এক সূত্র জানায়, পরবর্তী জিজ্ঞাসাবাদে রাত ২টার দিকে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় তাদের উপস্থিতি থাকার কথা জানতে পেরেছেন কর্মকর্তারা। দীপ পুলিশকে জানিয়েছেন, তাহসিফকে খুঁজে না পেয়ে তিনি সেখান থেকে নিজ দায়িত্বে চলে যান। উল্লেখ্য, রাজাবাড়ী ঘাট ও তৎসংলগ্ন এলাকা মাদকের বিভিন্ন আড্ডা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য পরিচিত হলেও সেখানে তাহসিফ বা দীপের যাতায়াতের উদ্দেশ্য কিংবা কোনো বিরোধের জেরে ঘটনাটি ঘটেছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

এদিকে তাহসিফের সাথে থাকা মোটরসাইকেলটির সন্ধান পেতে অনুসন্ধান চালিয়ে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে একটি কালো রঙের নম্বরপ্লেটবিহীন সুজুকি জিক্সার উদ্ধার করে পিবিআই। পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ জানান, মোটরসাইকেলটির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও নম্বর যাচাইয়ের প্রক্রিয়া চলছে; মালিকানা পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। স্থানীয় চায়ের দোকানদার জুবাইদা বেগম জানান, গাড়িটি রাস্তার পাশে দুদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকলেও কেউ দাবি করতে আসেনি, পরে পুলিশ এসে উদ্ধার করে নিয়ে যায়।

পরিবারের তথ্যমতে, মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফের মোবাইল থেকে তার মায়ের কাছে একটি শেষ বার্তা পাঠানো হয়, যা তদন্তে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। পরবর্তীতে উদ্ধারকালে তাহসিফের পকেটে তার ব্যবহৃত আইফোন ও হাতে ঘড়ি অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়। ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে ফোনটির অবস্থান, যোগাযোগের তথ্য ও বার্তা পাঠানোর সঠিক সময় ও স্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে। পিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান জানান, মেডিকোলিগ্যাল রিপোর্ট, সিসিটিভি চিত্র এবং উদ্ধার হওয়া ডিভাইসের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করেই মৃত্যুর সঠিক রহস্য বের করা সম্ভব হবে। তাহসিফের ফোন থেকে রাত ১টা ৩৫ মিনিটে পাঠানো বার্তার সঙ্গে কথিত ধাওয়ার সময়ের কোনো সম্পর্ক আছে কি। ওদের সুইমিংয়ের কোর্স করা এবং তার ওপর সার্টিফিকেট আছে। একজনের সঙ্গে আরেকজনের বিরোধ বা মতপার্থক্য থাকতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের প্রচলিত আইন ও নীতির মধ্যে থেকে তা সমাধানের চেষ্টা করা যায়।

নিহতের শরীরে সুরতহাল তৈরির সময় বড় ধরনের বড় কোনো আঘাত দৃশ্যমান না হলেও নাক দিয়ে রক্ত বের হওয়ার আলামত নথিভুক্ত করা হয়েছে। পরবর্তীতে সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়। তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম অভিযোগ করেন, তার ছেলের স্বাভাবিক মৃত্যুকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। পরিবারের পক্ষ থেকে এটিকে পরিকল্পিত অপরাধ বলে সন্দেহ করা হলেও ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে তারা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন।

উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, তাহসিফের পরিবারকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ বা মামলা দায়ের করতে বলা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, নিহতের পরিবার এবং দীপের থেকে পাওয়া বিভিন্ন বৈপরীত্যমূলক তথ্যের নিরপেক্ষ তদন্ত করা হচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে পরিবার মামলা দায়ের না করলেও রাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী পুলিশ নিজেই বাদী হয়ে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে এবং ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা