ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির শতবর্ষের ঐতিহ্যে সিক্ত জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে এক কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে পরিণত হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই এটি যেন এক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। পুরো এলাকাটি এখন যেন একটি পুলিশ ক্যাম্পে পরিণত হয়েছে।
সাউথ ফার্স্ট অনলাইনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকগুলোর কয়েকটি ঝালাই করে বন্ধ করে দিয়েছে এবং বাকিগুলো লোহার পাত ও দেয়াল দিয়ে অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়েছে।
ক্যাম্পাসের ভেতরে ও মেট্রো স্টেশনের কাছে প্রায় ১ হাজার থেকে ২ হাজার পুলিশ, আধাসামরিক বাহিনী ও আইটিবিপি সদস্য মোতায়েন রাখা হয়েছে। আশপাশের রাস্তাগুলোতে ব্যারিকেড বসানো হয়েছে।
পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ঢুকতে বা বের হতে পারছেন না। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় বিএনএসএসের ১৬৩ ধারার অধীনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
২৪ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনের প্রেক্ষাপট দীর্ঘদিনের। সর্বশেষ ২০০৫ সালে এখানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা ২০০৬ সালের মার্চ মাসে ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোনো অভিযোগ জানানোর সুযোগ সীমিত করে কেবল বিভাগীয় বিষয়ভিত্তিক সমিতি বা শ্রেণি প্রতিনিধিদের কাছে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। বর্তমানে শিক্ষার্থীরা ছাত্র সংসদ পুনরায় চালু, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা এবং দ্রুত নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করে ১৫ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন। শিক্ষার্থীরা বারবার প্রশ্ন তুলেছেন, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় বা জেএনইউতে যেখানে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন নির্বাচন নিষিদ্ধ থাকবে।
গত ১২ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের অনশন কর্মসূচির শনিবার ছিল ১৯তম দিন। আন্দোলনরতদের দাবি, তাদের বিরুদ্ধে করা সব বহিষ্কারাদেশ ও কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রত্যাহার করতে হবে। পাশাপাশি হোস্টেলে পানির সুব্যবস্থা, শৌচাগার উন্নয়ন এবং লাইব্রেরি ও ভর্তি সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান চান তারা। ১৯২০ সালের ২৯ অক্টোবর ব্রিটিশ শাসনামলে জাতীয়তাবাদী মুসলিম নেতাদের হাতে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবময় ইতিহাস ও বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে ব্যাপক বৈষম্য দেখছেন শিক্ষার্থীরা। তারা অভিযোগ করছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সরকার যৌথভাবে প্রতিষ্ঠানটিকে একটি ডিটেনশন সেন্টারের রূপ দিয়েছে। ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থার বিপরীতে স্বাধীন ও জাতীয়তাবাদী আদর্শ এবং আধুনিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে কাজ করার লক্ষ্য নিয়ে তারা এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছিলেন। শিক্ষার্থীদের মতে, যে প্রতিষ্ঠানের রয়েছে এমন গৌরবময় ইতিহাস, সেই প্রতিষ্ঠানটিই আজ শিক্ষার্থীদের অধিকার দমন করছে; তাদের ওপর সহিংসতা চালাচ্ছে।
আন্দোলন দমাতে প্রশাসনের বিরুদ্ধে নানা কূটকৌশলের অভিযোগ উঠেছে। গত ১৭ অক্টোবর ভোরে ক্যাম্পাসের সব আলো নিভিয়ে অনশনরত শিক্ষার্থীদের টেনেহিঁচড়ে বের করে দেওয়া হয় এবং মারধর করা হয়। নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অশালীন আচরণের অভিযোগও রয়েছে। পরে ‘আলোচনার’ নামে দুই শিক্ষার্থীর ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করে জোরপূর্বক তাদের স্বাক্ষর নেওয়া হয়, যার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দাবি করে যে আন্দোলন প্রত্যাহার করা হয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। এবিন বাসিল ও রেহান খানসহ অনেক শিক্ষার্থী এখনো অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন এবং নতুন করে অনেকে তাতে যোগ দিয়েছেন। অন্য শিক্ষার্থীরা এ ঘটনাকে একটি কূটকৌশল হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ক্যাম্পাসের বর্তমান অবস্থা রীতিমতো অবরুদ্ধ। লাইব্রেরি, হোস্টেল ও শৌচাগারগুলো তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের বের করে দেওয়ার লক্ষ্যে বিদ্যুৎ ও পানীয় জলের সরবরাহ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। ক্যান্টিন ও মেস বন্ধ থাকায় ভেতরে থাকা শিক্ষার্থীদের কাছে বাইরে থেকে খাবার বা পানি পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে সম্পত্তি নষ্ট ও একাডেমিক কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে আইনি ব্যবস্থার হুমকি দিচ্ছে। এতসব বাধা ও অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিস্থিতির মধ্যেও শিক্ষার্থীরা, বিশেষ করে ছাত্রীরা, তাদের প্রতিবাদ কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন। আবার যারা ভেতরে আছেন, তাদেরও বাইরে আসতে দিচ্ছেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের কাছে বাইরে থেকে খাবার বা পানি পৌঁছানোর চেষ্টা করলে কিংবা অনশনরতদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার উদ্যোগ নিলে তাতেও বাধা দেওয়া হচ্ছে।