দীর্ঘ তিন বছর স্থবিরতার পর গাজা উপত্যকায় নতুন শিক্ষাবর্ষের সূচনা হয়েছে। তবে যুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের কারণে স্বাভাবিক শ্রেণিকক্ষে ফেরার সুযোগ নেই বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর। স্কুল ভবনগুলো হয় ধ্বংস হয়েছে, না হয় ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রায় ৫ লাখ ৪১ হাজার শিক্ষার্থীর পাঠদান নিশ্চিত করতে তাঁবুভিত্তিক অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষ তৈরি করা হয়েছে। ফিলিস্তিনের শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত পুরো উপত্যকাজুড়ে প্রায় ৭০০টি তাঁবু স্থাপন করা হয়েছে এবং শিগগির আরও ২৫টি অস্থায়ী স্কুল কার্যক্রমের আওতায় আসবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যমতে, বর্তমান প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সরাসরি শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি অনলাইনেও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সরাসরি পাঠদানকেই প্রধান পদ্ধতি হিসেবে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তবে যারা গাজার ভেতরে সশরীরে উপস্থিত হতে পারছে না এবং যারা বাইরে অবস্থান করছে, তাদের জন্য অনলাইন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এতে প্রায় ৭০ হাজার শিক্ষার্থী গাজার ভেতর থেকে এবং ২০ হাজার শিক্ষার্থী বাইরের অঞ্চল থেকে যুক্ত হবে। যুদ্ধের আগে গাজার শিক্ষা অবকাঠামো বেশ শক্তিশালী থাকলেও ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, গাজার প্রায় ৯২ শতাংশ স্কুল ভবনই সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, যার ফলে প্রায় ৬ লাখ ৫৮ হাজার শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
শিক্ষার সময়ের ওপরও যুদ্ধের গভীর প্রভাব পড়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে বছরে স্বাভাবিক ২০০ শিক্ষাদিবসের পরিবর্তে তা কমে প্রায় ৬০ দিনে নেমে এসেছে। একইভাবে সাপ্তাহিক ক্লাসের মেয়াদ ৩০ ঘণ্টা থেকে হ্রাস পেয়ে ১২ ঘণ্টায় দাঁড়িয়েছে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে শিক্ষা কর্মকর্তাদের লক্ষ্য কেবল স্কুল পুনর্নির্মাণ নয়, বরং যুদ্ধের কারণে সৃষ্টি হওয়া শিক্ষার ঘাটতি পূরণ করতে একটি নমনীয় শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
অস্থায়ী কেন্দ্রগুলোতে মৌলিক শিক্ষা উপকরণের সংকট প্রকট। গাজার আল-হাদারা স্কুলে শিক্ষার্থীরা ছোট তাঁবুতে দুই শিফটে ক্লাস করতে বাধ্য হচ্ছে এবং অনেককে মেঝেতে বসেই পাঠ নিতে দেখা যাচ্ছে। বেঞ্চ, চেয়ার, বই ও খাতার তীব্র অভাব সত্ত্বেও দীর্ঘ বিরতির পর শিক্ষার্থীদের আবার শিক্ষার মূলধারায় ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা চলছে।
আল-আকসা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও জরুরিকালীন শিক্ষাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ওমর দাহলান এই পরিস্থিতিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি মনে করেন, স্থিতিশীল পরিবেশের অভাবে শিশুদের মৌলিক শেখার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই কেবল দ্রুত পাঠ্যক্রম শেষ না করে, শিক্ষার্থীদের হারিয়ে যাওয়া দক্ষতাগুলো শনাক্ত করে পৃথকভাবে তা পূরণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। কাতার নিউজ এজেন্সি, মিডল ইস্ট মনিটর ও এল পায়েস ইংলিশের তথ্যানুযায়ী, এই কার্যক্রম কেবল পাঠদান পুনরায় শুরু করার গল্প নয়, বরং ধ্বংসস্তূপ থেকে সীমিত সম্পদের মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি সংগ্রাম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চলতি শিক্ষাবর্ষে গাজায় প্রায় ৫ লাখ ৪১ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রচণ্ড গরমের পাশাপাশি তাঁবু ও অস্থায়ী স্থাপনায় শিক্ষাদানের কারণে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর সময়ও পিছিয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অন্যদিকে, অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষগুলোতেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পর্যাপ্ত বেঞ্চ-চেয়ার, বই, খাতা, কলম ও অন্যান্য শিক্ষা উপকরণেরও ঘাটতি রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গাজার নতুন শিক্ষাবর্ষ তাই শুধু পাঠদান পুনরায় শুরুর ঘটনা নয়; যুদ্ধের কারণে ভেঙে পড়া একটি শিক্ষা ব্যবস্থা কীভাবে সীমিত সম্পদে আবার সচল হওয়ার চেষ্টা করছে, তারও একটি চিত্র হয়ে উঠেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রতিবেদনটিতে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিহতের সংখ্যা বা রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত যুদ্ধ-সংক্রান্ত বর্ণনাকে মূল বিষয় না করে শিক্ষা সংকটকে কেন্দ্র করা হয়েছে; যেখানে সংখ্যা বা পরিস্থিতির তথ্য নেওয়া হয়েছে, সেখানে সংশ্লিষ্ট সূত্রের উল্লেখ রাখা হয়েছে।