দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন ও শোষণের শিকার বাংলাদেশকে মেরামতের লক্ষ্যে বর্তমান সরকার ‘থ্রি আর’ কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে। বাংলাদেশ সময় শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) ভোর ৪টায় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালে ফ্যাসিবাদমুক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশ নতুন করে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের পথে যাত্রা শুরু করেছে। গুম, খুন, অপহরণ, দুর্নীতি ও টাকা পাচারের অভিশাপ মুছে ফেলে রাষ্ট্রকে নতুন করে গড়ে তোলাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ মেরামতে সরকার রিকভারি (পুনরুদ্ধার), রস্টোরেশন (পুনর্বহাল) ও রিকনস্ট্রাকশন (পুনর্গঠন)—এই ‘থ্রি আর’ কৌশল অনুসরণ করছে। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের সামনে বর্তমানে অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত রয়েছে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশের কর্মক্ষম জনশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, সরকার শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয়, বরং অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন নিশ্চিত করতে চায়। যাতে প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির সুফল প্রতিটি নাগরিকের কাছে পৌঁছায়। তিনি আরও জানান, গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে দেওয়া ৩১ দফা কর্মসূচি ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজির ‘লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড’ বা কাউকে পিছিয়ে রাখা যাবে না—এই মূলমন্ত্রের সাথে সরকারের ৩১ দফার প্রত্যক্ষ সংযোগ রয়েছে। প্রতিটি সেক্টরে সহায়তার জন্য প্রবর্তন করা কার্ডগুলোকে সমন্বয় করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালু করাও সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে। জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজির ‘লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড’— এই প্রতিপাদ্যের সঙ্গে বর্তমান সরকারের ৩১ দফা কর্মসূচির কমপক্ষে ৭৩ শতাংশ কার্যক্রমের সরাসরি এবং ২৭ শতাংশ কার্যক্রমের পরোক্ষভাবে মিল রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার আশা করে, এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে শহর এবং গ্রামের মধ্যে উন্নয়ন বৈষম্য দূর হবে। একইসঙ্গে ২০৩০ এজেন্ডার সব ক্ষেত্রে, জবাবদিহিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নতুন যুগে বাংলাদেশের প্রবেশ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও বায়ো-টেকনোলজির মতো আধুনিক প্রযুক্তির সুফল সবার জন্য সমান হওয়া জরুরি। ডিজিটাল বিভাজন যেন আগামী দিনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বিভাজনে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। একইসঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর ও দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারেক রহমান। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী এবং ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সক্ষমতা আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে উন্নত প্রযুক্তি, জ্ঞান ও গবেষণার সুযোগ সবার নাগালের মধ্যে আনতে হবে।
সরকারপ্রধান জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ ‘স্বল্পোন্নত দেশ’-এর তালিকা থেকে উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং স্পোর্টস খাতে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নৈতিক মানসম্পন্ন কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এমন এক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায় সরকার, যেখানে তরুণরা নির্বিঘ্নে স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবে এবং নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করবে। রাষ্ট্রের নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এই কর্মযজ্ঞে নিজের উন্নয়ন সহযোগীদের পাশে পেতে চায় বাংলাদেশ। সেই লক্ষ্য পূরণে ইতোমধ্যেই, ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং ই-হেলথ কার্ড এর মতো বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে, সরকার অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য সহায়তা কর্মসূচি চালু করেছে।