হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা ফের চরম আকার ধারণ করেছে। প্রায় এক মাসের আপেক্ষিক শান্তির পর গত শনিবার থেকে দুই দেশ সমুদ্রপথে একে অপরের সংশ্লিষ্ট জাহাজে পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু করেছে। এই সংঘাতের ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথটিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ ও বৈশ্বিক বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, ইরান-সংশ্লিষ্ট তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারে তারা সফল অভিযান চালিয়েছে। এর মধ্যে ওমান উপসাগরে থাকা একটি জাহাজকে সম্পূর্ণ ধ্বংস এবং খার্গ দ্বীপের কাছে থাকা আরও দুটি জাহাজকে স্থায়ীভাবে অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হামলার শিকার এই ট্যাংকারগুলো ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ও তাদের মিত্রদের অর্থায়নে পরিচালিত বহু বিলিয়ন ডলারের ছায়া নেটওয়ার্কের অংশ।
মার্কিন হামলার কয়েক ঘণ্টা পর আইআরজিসি পাল্টা জবাব দেওয়ার দাবি করেছে। তারা জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারসহ মার্কিন-সংশ্লিষ্ট মোট ছয়টি জাহাজে তারা আঘাত হেনেছে। ইরানের দাবি, ওই ট্যাংকারগুলো প্রণালিতে অননুমোদিত রুট ব্যবহার করছিল। এর আগে সেন্টকম জানিয়েছিল, ইরানের হামলার মূল লক্ষ্য ছিল একটি বিমানবাহী রণতরী ও একটি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার, তবে মার্কিন জাহাজগুলো সেই আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে এবং এতে কোনো সেনা হতাহত হয়নি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইরিব জানিয়েছে, খার্গ দ্বীপের কাছে হামলার শিকার ট্যাংকারটিতে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। এছাড়া ওমান উপসাগরে ক্ষতিগ্রস্ত অন্য দুটি ট্যাংকারের ক্রুদের লাইফবোটে করে নিরাপদে তীরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, খার্গ দ্বীপ ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনাল হিসেবে পরিচিত।
সংঘাতের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত রোববার থেকেই যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে সামরিক তৎপরতা শুরু করে। মার্কিন বাহিনী জানায়, হরমুজ প্রণালিতে নৌমাইন স্থাপনের কাজে ব্যবহৃত হতে পারে এমন দুটি রকেট লঞ্চার ধ্বংস করতেই ওই অভিযান চালানো হয়। এরপর মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও একটি বড় ধরনের হামলার কথা উল্লেখ করেন এবং সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে দাবি করেন। এর আগে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, ইরান মার্কিন জাহাজে হামলা চালালে তাদের তেলবাহী ট্যাংকারগুলো ডুবিয়ে দেওয়া হবে।
এদিকে, দক্ষিণ ইরানের সিরিক শহরে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন হামলায় অন্তত চারজন নিহত হওয়ার দাবি করেছে তেহরান। নিহতদের মধ্যে দুটি শিশু রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, একটি ক্ষেপণাস্ত্রের টুকরো ওই বাড়িতে আঘাত হানে। তেহরান এই ঘটনাকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
এই দাবির বিষয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স চরম সংশয় প্রকাশ করেছেন। বৃহস্পতিবার তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করা হবে। এর আগে ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
বিশ্বের তেল ও গ্যাস সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধ শুরুর পর ফেব্রুয়ারি থেকেই এই জলপথ কার্যত বন্ধ রয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, প্রণালিটি এখনো খোলা রয়েছে এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় বিকল্প রুট দিয়ে জাহাজ চলাচলে তারা সহায়তা করছে। তবে ওই বিকল্প রুট ব্যবহারকারী জাহাজগুলোও নিয়মিত হামলার শিকার হচ্ছে।
চলমান এই সংঘাতের অবসানে ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরিস্থিতিকে ‘ছোটখাটো বিষয়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, তবে পাল্টাপাল্টি হামলার এই ঘটনা হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সামরিক ও বাণিজ্যিক ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একই সঙ্গে ঘটনাটি তদন্ত করা হবে বলেও জানান তিনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দেশটির বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এই দ্বীপের মাধ্যমে রপ্তানি করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ ইরানের জন্য বড় ধরনের চাপ তৈরির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।