যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা ইপিএ এবং জার্মান রাসায়নিক জায়ান্ট বায়ারের মধ্যকার এক বিশেষ যোগাযোগের তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিতর্কিত আগাছানাশক ডাইকাম্বা ব্যবহারের নিয়ম তৈরির সময় ইপিএ সরাসরি বায়ারকে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার বিকল্প থেকে নিজেদের পছন্দেরটি বেছে নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল বলে জানা গেছে। ডাইকাম্বা ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সে বিষয়ে কয়েকটি বিকল্প প্রস্তাব বায়ারের কাছে উপস্থাপন করেছিল ইপিএ। এর মধ্যে বায়ারের পছন্দের ব্যবস্থাগুলোই পরবর্তী সময়ে ফেডারেল নিয়মে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে বিভিন্ন নথিতে উঠে এসেছে।
ইপিএর অভ্যন্তরীণ নথিপত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডাইকাম্বা ব্যবহারের সময় বাতাসে উড়ে অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়া বা ‘ড্রিফট’ এবং পানির সঙ্গে ভেসে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে বিভিন্ন মাত্রার নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। নথির শেষাংশে ‘রেজিস্ট্র্যান্ট রেসপন্স নিডেড’ শিরোনামের এক অংশে জানতে চাওয়া হয়েছিল কোন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দেখা গেছে, বায়ার এক্ষেত্রে সুরক্ষামূলক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ছাড় দিয়ে তুলনামূলক কম কঠোর বা মাঝামাঝি মাত্রার নিয়ম বেছে নিয়েছে। বায়ারের চাহিদামতো আরও কিছু পরিবর্তনও চূড়ান্ত নীতিমালায় যুক্ত হয়েছে বলে নথিতে দেখা গেছে।
এই পুরো প্রক্রিয়াটির তীব্র সমালোচনা করেছেন সেন্টার ফর বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটির পরিবেশগত স্বাস্থ্যবিষয়ক পরিচালক নাথান ডনলি। তার মতে, একটি পণ্য নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা সংস্থা যদি ওই পণ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানকেই নির্ধারণ করতে দেয় যে কীভাবে তাদের পণ্য নিয়ন্ত্রিত হবে, তবে সেই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। ডাইকাম্বা নিয়ে চলমান আইনি লড়াইয়ের নথিপত্র থেকেই ইপিএ ও বায়ারের মধ্যে এই গোপন সমঝোতার বিষয়টি সামনে আসে। একই সঙ্গে ইপিএর উচ্চপর্যায়ে রাসায়নিক শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
যদিও ইপিএ এই অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। সংস্থাটির এক মুখপাত্র দাবি করেছেন, এটি কোনো নিয়ম ভঙ্গের ঘটনা নয়, বরং নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা প্রথাগত নিয়মেই কাজ করেছে। তার ভাষ্যমতে, কীটনাশক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের পণ্যের কার্যকারিতা ঠিক রেখে ঝুঁকি কমানোর উপায় নিয়ে প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংস্থাটিই নিয়ে থাকে এবং নিজস্ব নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাও তৈরি করে।
ডাইকাম্বা মূলত একটি শক্তিশালী আগাছানাশক, যা ব্যবহারের পর বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে পার্শ্ববর্তী সবজিখেত, কৃষিজমি, বাগানের গাছপালা ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলের ব্যাপক ক্ষতি করে বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে অনুমোদনের পর থেকেই এটি নিয়ে নানা আইনি লড়াই ও ব্যাপক জনঅসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের আদালত ডাইকাম্বার ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে দুবার এটি বাজার থেকে সরানোর নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু তারপরও ইপিএ নতুন করে এর অনুমোদন বজায় রাখে। সেন্টার ফর বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটি ও সেন্টার ফর ফুড সেফটির মতে, বর্তমান অনুমোদনে আগের চেয়ে সুরক্ষা ব্যবস্থা অনেক শিথিল করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডাইকাম্বার প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক মিলিয়ন একর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেকে একে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি ইতিহাসে আগাছানাশকের কারণে হওয়া অন্যতম বড় বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এছাড়া স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েও রয়েছে গভীর উদ্বেগ; বিশেষ করে লিভার ক্যানসার ও নন-হজকিন লিম্ফোমার মতো রোগের সঙ্গে এই রাসায়নিকের যোগসূত্র থাকার বিষয়টি বিভিন্ন গবেষণায় আলোচিত হয়েছে। যদিও এসব ঝুঁকির বিষয়ে ইপিএর নিজস্ব মূল্যায়নের সঙ্গে স্বাধীন গবেষকদের তথ্যের অমিল রয়ে গেছে। আপাতত, বায়ারকে পছন্দমতো নিয়ম বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি ডাইকাম্বার নতুন অনুমোদন সংক্রান্ত আইনি বিতর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।