কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী নির্যাতন ও নানা ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রতিহত করতে দেশের ছয়টি কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড এবং এর অধীনে থাকা সব প্রতিষ্ঠানের জন্য কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি’আতিল কওমিয়া বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সম্প্রতি এই নীতিমালা প্রকাশ করা হয়। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের কিছু অনৈতিক ঘটনার খবর প্রকাশের পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
গত ১২ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত আল-হাইআতুল উলয়ার স্থায়ী কমিটির ৬৯তম সভা এবং এর আগে গত ২৯ জুলাই সাব-কমিটির সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এসব নির্দেশনা চূড়ান্ত করা হয়। ওলামায়ে দেওবন্দের শিক্ষা ও তারবিয়াতসংক্রান্ত রচনাবলি এবং প্রখ্যাত দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলোর ফতোয়ার আলোকে এই নির্দেশনাগুলো তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বোর্ড।
নতুন নির্দেশনায় শিক্ষার্থীদের শাস্তির ক্ষেত্রে প্রহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কোনো শিক্ষার্থীকে শাসন করার একমাত্র উদ্দেশ্য হতে হবে তার সংশোধন ও কল্যাণ, কোনোভাবেই প্রতিশোধ নেওয়া যাবে না। রাগের মুহূর্তে কোনো শিক্ষার্থীকে শাস্তি দেওয়া থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। শাস্তির ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে এগোতে হবে—প্রথমে নম্রভাবে সতর্ক করা, প্রয়োজনে মৃদু ভর্ৎসনা এবং রাগ-ধমকের মাধ্যমে সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে। একান্ত প্রয়োজন হলে সর্বশেষ ধাপে অভিভাবককে ডেকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানিয়ে তাদের সহায়তায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।
তবে কোনো অবস্থাতেই লাঠি, বেত বা কোনো যন্ত্র দিয়ে আঘাত করা, মুখমণ্ডল, মাথা কিংবা স্পর্শকাতর অঙ্গে আঘাত করা এবং হাড় ভাঙা, রক্তপাত বা দাগ সৃষ্টি হয়—এমন যেকোনো শারীরিক শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকাশ্যে অপমান, গালমন্দ, কটু ভাষা, ঘৃণাসূচক নামে ডাকা এবং যেকোনো ধরনের মানসিক নির্যাতন থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে। এসব নির্দেশনা অমান্যকারী শিক্ষক বা শিক্ষিকাকে শরিয়ত ও প্রচলিত বিধি অনুযায়ী জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।
শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি মাদ্রাসায় ছাত্রছাত্রী-সুরক্ষা কমিটি গঠন বা পুনর্গঠন করে তা সক্রিয় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষক, শিক্ষার্থী বা কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অসদাচরণ, নির্যাতন কিংবা হয়রানির অভিযোগ জানানোর সুযোগ রাখতে হবে। অভিযোগ পাওয়ার পর সাত দিনের মধ্যে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্ত চলাকালে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানে সুরক্ষা কমিটি না থাকা, তা নিষ্ক্রিয় থাকা কিংবা অভিযোগ পেয়েও ব্যবস্থা না নেওয়ার সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসার ইলহাক বা অধিভুক্তি স্থগিত বা বাতিল করা হতে পারে।
শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পারস্পরিক দূরত্ব ও সমস্যা দূর করতে নিয়মিত ইসলাহী মজলিশ আয়োজনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নবনিযুক্ত শিক্ষকদের জন্য বাধ্যতামূলক তারবিয়াতি মজলিশ এবং নিয়মিত অভিভাবক-সমাবেশ আয়োজনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। মাদ্রাসাগুলোর সার্বিক কার্যক্রম তদারক করার জন্য প্রতিটি বোর্ডে আলাদা ‘মাদ্রাসা মনিটরিং সেল’ এবং অভিযোগ গ্রহণের জন্য পৃথক হটলাইন চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয়ভাবে যোগাযোগের জন্য আল-হাইআতুল উলয়ার হটলাইন নম্বর ০১৭০০-৭৬৩১৭৮ (হোয়াটসঅ্যাপ) চালু রাখা হয়েছে।
শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীদের চরিত্র ও বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, মিথ্যা অপবাদ, ভিত্তিহীন সংবাদ বা মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার হওয়া নিরপরাধ শিক্ষক, শিক্ষিকা, মুহতামিম বা প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে বোর্ডগুলোর প্রতি।
আল-হাইআতুল উলয়া জানিয়েছে, কোনো ব্যক্তি অপরাধ বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়ালে তার নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং অপরাধীকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তবে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার কারণে পুরো কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা, লাখ লাখ শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকসমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কিংবা ব্যক্তির অপরাধের দায় সামগ্রিক আলেম সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপানো উচিত নয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অবিলম্বে জনপ্রতিনিধিদের নৈতিক আচরণবিধি প্রণয়নের আহ্বান টিআইবির। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এসব ক্ষেত্রে অভিযোগ পাওয়ার ৭ দিনের মধ্যে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নির্দেশনা তৈরিতে মাওলানা আশরাফ আলী থানভী, শায়খুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মদ যাকারিয়া কান্ধলভীসহ ওলামায়ে দেওবন্দের শিক্ষা ও তারবিয়াতবিষয়ক রচনাবলি এবং প্রসিদ্ধ দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলোর ফতোয়া অনুসরণ করা হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ ছাড়া বিভিন্ন জেলায় মাদ্রাসার প্রধানদের নিয়ে নিয়মিত সভা করা হয়, যেখানে নির্দেশনা ও নীতিমালার বাস্তবায়ন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়।