জাতিসংঘের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের শেষ পর্যায়ে এসে নিউইয়র্কে আয়োজিত ৮১তম সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে বিদায়ী ভাষণ দিয়েছেন আন্তোনিও গুতেরেস। মঙ্গলবার এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় তিনি বিশ্বনেতাদের সামনে চলমান বৈশ্বিক সংকটগুলো নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান জানান। গুতেরেস তার বক্তব্যে প্রধানত চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, জলবায়ু পরিবর্তন রোধ এবং জাতিসংঘের বর্তমান কাঠামো সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
দ্রুত বর্ধনশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বলেন, এআই প্রযুক্তি মানবসভ্যতার জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিলেও এর ঝুঁকিগুলো বোঝার আগেই প্রযুক্তির বিকাশ অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে। এ ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবক দেশগুলোকে নিরাপত্তাঝুঁকি সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য আদান-প্রদান এবং প্রযুক্তির মূল্যায়নে পারস্পরিক সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি। কেবল বিচ্ছিন্নভাবে কোনো দেশের নেওয়া পদক্ষেপ যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করে তিনি বহুপক্ষীয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো ও স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেন।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে গুতেরেস লোহিত সাগরে হুথিদের কর্মকাণ্ডের ফলে নৌ-পরিবহন ও হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্ট সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে স্পষ্টভাবে বলেন, ঐতিহাসিক এই কক্ষ থেকে আমাদের একটি অভিন্ন বার্তা দেওয়া প্রয়োজন যে, যুদ্ধ এখনই বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনের মতো সংযুক্তিকরণমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ এবং রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটে আন্তর্জাতিক আইন ও সনদ মেনে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ খোঁজার তাগিদ দেন তিনি।
জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় দূষণকারীদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে মহাসচিব বলেন, যারা পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী, তাদেরই এর খেসারত দিতে হবে। সেই সঙ্গে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতা নিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাগুলো অতীতের ক্ষমতার ভারসাম্যকে প্রতিফলিত করে, যা বর্তমান চাপের মুখে টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। উল্লেখ্য, এই অধিবেশনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, ভারত, জার্মানি এবং দক্ষিণ আফ্রিকার শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি বৈশ্বিক কূটনৈতিক টানাপোড়েনের ইঙ্গিত দেয়।
বিদায়ী এই ভাষণে গুতেরেস অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে গত দশ বছর পাশে থাকা বিশ্বনেতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আগামী ১ জানুয়ারি থেকে আমি আর মহাসচিব থাকব না, তবে আমি যেখানেই থাকি না কেন, শান্তি যে সম্ভব—এই বিশ্বাসের পক্ষে আজীবন কাজ করে যাব। ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি নবম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করা গুতেরেস ২০২২ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে পুনর্নিয়োগ পেয়েছিলেন, যার মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে এ বছরের ৩১ ডিসেম্বর। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গুতেরেস জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ অচলাবস্থার কথাও তুলে ধরেন, কারণ নিউইয়র্কে প্রায় ১৩০ জন বিশ্বনেতা সমবেত হলেও এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত এবং জার্মানির নেতারা এই কূটনৈতিক সমাবেশ এড়িয়ে গেছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গত ১০ বছর ধরে পাশে থাকা বিশ্বনেতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আগামী ১ জানুয়ারি যখন আমি আর মহাসচিব থাকব না, তখন এই বিষয়ে নিশ্চিত থাকুন; আমি যেখানেই থাকি না কেন, যাই করি না কেন; শান্তি যে সম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, ‘যেসব দেশ এআই প্রযুক্তির বিকাশে নেতৃত্ব দিচ্ছে, তাদের উদ্ভূত নিরাপত্তাঝুঁকি সম্পর্কে তথ্য ভাগাভাগি করতে হবে এবং প্রযুক্তির পরীক্ষা ও মূল্যায়নে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে’। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রসঙ্গ টেনে গুতেরেস বলেন, লোহিত সাগর উপকূলজুড়ে হুথিদের অগ্রগতির ফলে নৌ-পরিবহন রুট হুমকিতে পড়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে তিনি উত্তেজনা হ্রাস ও আলোচনার ওপর জোর দেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তিনি বলেন,‘ আসুন, এই ঐতিহাসিক হল থেকে আমরা সবাই একটি স্পষ্ট বার্তা পাঠাই, যুদ্ধ এখনই থামাতে হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ সুগম করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে নৌচলাচলের স্বাধীন অধিকার পুরোপুরি ফিরিয়ে দিতে হবে’।