যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান বৈরী সম্পর্কের জেরে সৃষ্ট উত্তেজনা নিরসনে কূটনীতিকেই একমাত্র উপায় হিসেবে দেখছে ইরান। সম্প্রতি হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করা এবং সংঘাত থামানোর লক্ষ্যে ইরান একটি শান্তি প্রস্তাব ঘোষণা করেছিল, কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। ট্রাম্পের দাবি, ইরান বর্তমানে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হওয়ার পথে, তাই সংকট থেকে মুক্তি পেতে তারা মরিয়া হয়ে এ ধরনের প্রস্তাব দিচ্ছে। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সামনে ট্রাম্প স্পষ্টভাবে জানান, তিনি এই প্রস্তাব গ্রহণ করছেন না। একমাত্র আলোচনার মাধ্যমেই এই অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।’। সংবাদমাধ্যমটি তাদের তথ্যের উৎস হিসেবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তাদের কথা উল্লেখ করেছে। তিনি আরও যোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র রাজি হলে উভয় দেশ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও আলোচনার টেবিলে বসতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বিষয়টি নিয়ে তার ভিন্নমত তুলে ধরেছেন। তার ভাষ্যমতে, ট্রাম্প প্রকাশ্যে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের কথা বললেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যারা মধ্যস্থতা করছেন, তাদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তেহরান এখনো কোনো সিদ্ধান্ত পায়নি। আরাঘচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, তারা মধ্যস্থতাকারীদের বার্তার অপেক্ষায় আছেন এবং এরপরই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই যদি চুক্তি করতে আগ্রহী হয় এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে চায়, তবে ইরান সব ধরনের প্রস্তুতির সাথেই রয়েছে। আরাঘচি তার পোস্টে লিখেছেন, ‘আমরা মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে চূড়ান্ত মতামতের অপেক্ষায় আছি।
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ইরান তাদের সাত দিনের এই শান্তি পরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছিল, যা কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে পৌঁছায়। প্রস্তাবিত চুক্তিতে প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য সাত দিনের সময়সীমা এবং আঞ্চলিক লড়াই সাময়িক বন্ধ রাখার শর্ত যুক্ত ছিল। এদিকে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের মনে ইরানের শর্ত পূরণের সদিচ্ছা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তিনি তার ঘনিষ্ঠ মহলে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর তিনি ইরানে সামরিক অভিযান বা বোমা হামলার পথ খোলা রাখছেন। যুদ্ধ বন্ধে ইরানের ৭ দিনের পরিকল্পনায় যা আছে। সেই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ট্রাম্পের মনে সন্দেহ রয়েছে যে ইরান তার দাবিগুলো আদৌ মানবে কি না।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর ইরানকে দমানোর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, যার ফলে ওই অঞ্চলে পণ্য পরিবহন ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়েছে। তবে ট্রাম্প বরাবরই দাবি করেন যে, এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। সংকট নিরসনে ইরান সৌদি আরবের সঙ্গেও আলোচনা করেছে। সাত মাস ধরে চলা এই অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে জ্বালানি তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি বিশ্বকে ভাবিয়ে তুলেছে। এর ফলে ওই এলাকায় জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সিবিএস নিউজের ‘ফেস দ্য নেশন’ অনুষ্ঠানে সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তেহরান পরমাণু কর্মসূচি ও অন্যান্য ইস্যুতে আলোচনার জন্য প্রস্তুত, কিন্তু কোনো ধরনের হুমকি বা জবরদস্তি তারা মেনে নেবে না। তিনি স্পষ্ট করেছেন, ইরান যুদ্ধ চায় না, তবে আত্মরক্ষার অধিকার তারা সংরক্ষণ করে। পরমাণু অস্ত্র তৈরির বিষয়ে ইরান আগেই সম্মত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পরমাণু কর্মসূচির বিষয়ে তেহরানের অবস্থান কঠোর। দেশটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, শান্তি চুক্তি হলেও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠানোর মতো ইস্যুতে তারা কোনো আপস করবে না। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে যে যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, তা এখনো অব্যাহত রয়েছে। এই সংঘাতে হাজার হাজার প্রাণহানি হয়েছে এবং ইরানের সামরিক শক্তি ও অর্থনৈতিক কাঠামো চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। উপসাগরীয় এলাকায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে উত্তেজনা পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে, যার সঙ্গে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের কর্মকাণ্ডও যুক্ত রয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ থামাতে আগের সব কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।