ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, যিনি বর্তমানে গাজায় গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত, গত ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে ভাষণ দিতে নিউইয়র্কে পৌঁছান। একসময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বন্ধুত্বের গভীরতা বোঝাতে ‘ইস্পাতকঠিন’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এবারের সংক্ষিপ্ত সফর সেই দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের সমীকরণ বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আট ঘণ্টারও কম সময়ের এই সফরে তার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোনো বৈঠকের সূচি ছিল না, যা গত বছরের সপ্তাহব্যাপী সফরের তুলনায় একেবারেই বিপরীত এক চিত্র। এ যেন অনেকটা ‘দোস্ত দোস্ত না রাহা’-কাহিনি। গত ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দিতে এসে ‘বিশ্বের সবচেয়ে ঘৃণিত নেতা’র খেতাব পাওয়া ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে যেন ‘মুখ লুকিয়ে পালাতে’ হলো। একইদিনে, বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক সংবাদের শিরোনাম করে—‘নেতানিয়াহুর স্বল্পসময়ের নিউইয়র্ক সফর মার্কিন সম্পর্কের টানাপড়েনের প্রতিফলন।’। গত বছর তিনি মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে করেছিলেন। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানানো হয়, এ বছর নিউইয়র্কে নেতানিয়াহু ৮ ঘণ্টার কম সময় থেকে থাকতে পারেন। গাজার ধ্বংসস্তূপে অগণিত মরদেহ, সঙ্গে অবিস্ফোরিত বোমা।
এবারের সফরে নেতানিয়াহুর জন্য পরিস্থিতি ছিল অনেকটাই প্রতিকূল। তিনি যখন জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়ার জন্য মঞ্চে ওঠেন, তখন হলরুমের বিশাল একটি অংশ ফাঁকা দেখা যায়। অনেক দেশের প্রতিনিধিরাই তার ভাষণের সময় অধিবেশনস্থল ত্যাগ করেন। ফক্স নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে এই কূটনীতিকরা ওয়াকআউট করেন। সম্মেলনে সভাপতিদের আসনে থাকা ব্যক্তিরাও এই প্রতিবাদ থেকে বাদ যাননি। অথচ অতীতে যুক্তরাষ্ট্রে নেতানিয়াহুর প্রতিটি সফর ইসরায়েলি জনগণের সামনে ব্যাপক গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হতো, যা এবার অনুপস্থিত ছিল।
নেতানিয়াহুর নিউইয়র্ক আগমনকে কেন্দ্র করে শহরজুড়ে চলে তীব্র বিক্ষোভ। অস্কারজয়ী শিল্পীসহ অসংখ্য মানুষ ও বিভিন্ন ইহুদি সংগঠনের কর্মীরা তাকে ‘শয়তান’ বা ‘শিশু হত্যাকারী’ হিসেবে অভিহিত করে স্লোগান দেন। নিউইয়র্কের ফিলিস্তিন বংশোদ্ভূত রাজনীতিক জোহরান মামদানি এ সময় নেতানিয়াহুর কঠোর সমালোচনা করেন। বিক্ষোভকারীরা ‘ইসরায়েলে অস্ত্র পাঠানো বন্ধ করো’ এবং ‘গাজায় গণহত্যা থামাও’—এমন প্ল্যাকার্ড হাতে রাজপথে নামেন। সমাবেশে অংশ নেওয়া শতাধিক মানুষকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে বলেও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জনমানসেও ইসরায়েল ইস্যুতে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। জুলাই মাসে পিউ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপ অনুযায়ী, সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব বাড়ছে। জুইশ ভয়েস ফর পিস অ্যাকশন-এর পরিচালক বেথ মিলার জানান, মার্কিন করদাতারা এখন আর তাদের অর্থ দিয়ে ইসরায়েলি সরকারকে সহায়তা করতে ইচ্ছুক নন। এছাড়া, আন্তর্জাতিক আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে চলা নেতানিয়াহুর প্রতি ইউরোপীয় ঘনিষ্ঠ মিত্রদের বিরক্তিও ক্রমে বাড়ছে। জার্মানি এবং ফ্রান্সের মতো দেশগুলোর বর্তমান অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইসরায়েলের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থনের ভিত এখন বেশ নড়বড়ে। ইসরায়েলের প্রভাবশালী দৈনিক হারেৎজ তাদের সম্পাদকীয়তে মন্তব্য করেছে যে, নেতানিয়াহুর এই বিচ্ছিন্নতা কেবল কূটনৈতিক নয়, বরং তা ইসরায়েলের সামগ্রিক ভাবমূর্তিকে সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বাড়ি এসে তার দেখা তো পাওয়া গেলই না, এমনকি কথা বলার সুযোগও মিললো না। উল্টো দেখা গেল—‘সবচেয়ে বড় শত্রুর সবচেয়ে বড় বন্ধুর’ সঙ্গে নিজের ঘনিষ্ঠ বন্ধুর দহরম-মহরম।