৩৬ বছরের দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক জীবনে অত্যন্ত দক্ষ ও কর্মঠ হিসেবে পরিচিত ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমার এখন বড় ধরনের এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। বর্তমানে ৬২ বছর বয়সী এই কর্মকর্তা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) বা বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা কর্মসূচির মাধ্যমে ভোটার তালিকা সংশোধনের যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে। ভারতের আমলাতন্ত্রে ৩৬ বছরের দীর্ঘ কর্মজীবনের বেশিরভাগ সময় জুড়ে জ্ঞানেশ কুমার কঠিন কাজগুলো সম্পন্ন করার জন্য সুনাম অর্জন করেছিলেন। তবে বর্তমানে ৬২ বছর বয়সী কুমার নিজের প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে এক ভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন। কুমার ব্যক্তিগতভাবে এই তদন্তের বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। তবে এই প্রতিক্রিয়া বিতর্কটির অবসান ঘটাতে পারেনি।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, গত বছর বিহার থেকে শুরু হওয়া এই তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়াটি ভারতের প্রায় ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। এ সময় খসড়া ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, যা ভারতের মোট ভোটারের প্রায় ১৩ শতাংশ। নির্বাচন কমিশনের ভাষ্যমতে, তালিকায় থাকা নকল এবং অযোগ্য ভোটারদের সরিয়ে বৈধ নাগরিকদের তালিকা নিশ্চিত করাই এই প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য। তবে বিরোধী দলগুলো এবং বিভিন্ন অধিকার কর্মী এই কর্মকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলছেন, এর ফলে অনেক প্রকৃত ভোটার ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন।
বিতর্কটি নতুন মোড় নেয় যখন ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি তদন্তে প্রকাশ পায় যে, কমিশনের ভেতরেই ব্যাপক মতবিরোধ রয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জ্ঞানেশ কুমারের দুই সহকর্মী—নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী—গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও আদেশের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানিয়েছেন। এই মতবিরোধগুলো মূলত ভোটার তালিকায় নাম সংযোজন-বিয়োজন, নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং বিশাল ভোটার ডেটাবেজে প্রবেশের সুযোগের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতার নীতি অনুসরণ করা হয়। যদিও কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অভ্যন্তরীণ বিভক্তির কথা স্বীকার করেনি এবং জানিয়েছে যে গত এক বছরের সব সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়া হয়েছে, তবুও এই ঘটনা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। পরবর্তী সময়ে তিন কমিশনার একসাথে একটি বৈঠক করেন এবং যৌথ বিবৃতি দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। তবে এই পদক্ষেপের পরও বিরোধী দলগুলো সংসদে জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবি তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) বড় ধরনের আন্দোলনের হুমকি দিয়েছে। অন্যদিকে, অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এন চন্দ্রবাবু নাইডু কমিশনের স্বচ্ছতার ওপর আস্থা প্রকাশ করে তাদের অবস্থানকে সমর্থন করেছেন। তদন্তের পর প্রকাশিত এক বিবৃতিতে কমিশন প্রতিবেদনে উল্লিখিত মতবিরোধ অস্বীকার করেনি, তবে কোনো অভ্যন্তরীণ ফাটলের কথা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং জানিয়েছে যে মতের পার্থক্য স্বাভাবিক আলোচনার অংশ এবং গত এক বছরের সিদ্ধান্তগুলো সর্বসম্মতভাবেই নেওয়া হয়েছিল।
জ্ঞানেশ কুমারের কর্মজীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি ১৯৮৮ সালে আইএএস হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং কেরালার এর্নাকুলামের ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর থাকাকালীন কোচির ওয়াটারফ্রন্ট প্রকল্পের মতো বেশ কিছু সফল কাজ সম্পন্ন করেছেন। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে জম্মু ও কাশ্মীর বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০১৯ সালে জম্মু ও কাশ্মীর পুনর্গঠন বিলের খসড়া তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এছাড়া সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণের তদারকি ট্রাস্ট গঠনেও তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। কুমারের অতীত কর্মজীবন সম্পর্কে জানা যায়, তিনি উত্তরপ্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন এবং আইআইটি কানপুরে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করার পর ১৯৮৮ সালে আইএএস-এ যোগ দেন।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অবসর গ্রহণের পর মার্চ মাসে তিনি নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পান এবং ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হন। ২০২৩ সালের নতুন আইনে নিয়োগ পাওয়া প্রথম সিইসি হলেন তিনি, যে আইনটি বর্তমানে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ‘ইসি ২.০’ নামক প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও বর্তমানে এসআইআর সংক্রান্ত বিতর্কই তার কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় সমালোচনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতের সরকারের সবচেয়ে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল কিছু দায়িত্ব সামলানোর পরও দীর্ঘদিন জনসমক্ষের বাইরে কাটানো একজন আমলার জন্য এটি একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি।
কমিশন দাবি করেছে যে, ভবিষ্যতে এই ধরনের বিতর্ক এড়াতে সভার এজেন্ডা ও কার্যবিবরণী পূর্বেই প্রকাশের নতুন নিয়ম চালু করা হচ্ছে। তবে ভোটার তালিকা থেকে কোটি কোটি নাম বাদ যাওয়ার এই ঘটনা ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে জনগণের আস্থায় বড় ধরণের চিড় ধরিয়েছে।