ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় নতুন করে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে এই অঞ্চলে নতুন করে যুদ্ধবিমান, রণতরী ও অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যদিও এই বিশাল সামরিক প্রস্তুতির প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি কেবল সামরিক আগ্রাসনের প্রস্তুতি না-ও হতে পারে; বরং ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির দরকষাকষিতে দেশটিকে চাপের মুখে রাখাও এর লক্ষ্য হতে পারে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ অবশ্য জানিয়েছেন, যেকোনো পরিস্থিতির জন্য মার্কিন বাহিনী পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। ইরানের চারপাশ আবার ঘিরে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র।
চলমান এই উত্তেজনার মধ্যেই আল জাজিরাকে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো ঘাঁটি থেকে ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট বিমানবাহী রণতরী বহর মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। এর পরপরই মেকিন আইল্যান্ড মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটও রওনা হয়েছে, যার মধ্যে ২ হাজারের বেশি মেরিন সেনা রয়েছে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বলছে, এই রণতরী ও নৌবাহিনীর অন্যান্য জাহাজ মোতায়েনের ফলে প্রায় ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার অতিরিক্ত মার্কিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক বলয়ে যুক্ত হচ্ছে। সব মিলিয়ে নভেম্বরের শেষ নাগাদ ওই অঞ্চলে তিনটি বিমানবাহী রণতরী ও দুটি উভচর অবতরণকারী বহর অবস্থান করবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা ট্রাম্পের সামরিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রকে আরও বিস্তৃত করবে। এর মধ্য দিয়ে যুদ্ধ অষ্টম মাসে প্রবেশ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশলী পদক্ষেপ এমন এক সময়ে নেওয়া হলো, যখন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, নিজের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় ট্রাম্প এমন কঠোর অবস্থান নিচ্ছেন কি না, সেটিও পর্যালোচনার বিষয়। এদিকে, এই সেনা মোতায়েনের বিষয়ে ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি সরাসরি কোনো উত্তর দেননি। টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ইরানে বোমা হামলার সম্ভাবনা উড়িয়ে না দিয়ে রহস্যময়ভাবে বলেছেন যে, কোথায় হামলা হবে তা আগেভাগে বলা সম্ভব নয়। তবে এসব মোতায়েনের মাধ্যমে তিনি ইরানে নতুন করে ভয়াবহ হামলা চালানোর ইঙ্গিত দিচ্ছেন কিনা তা-ও স্পষ্ট নয়। সেই নির্বাচনে নিজের পতনশীল ইমেজ কিছুটা হলেও পুনরুদ্ধারের চেষ্টা হিসেবে ট্রাম্প এমন প্রস্তুতি নিয়ে থাকতে পারেন। সর্বশেষ সেনা মোতায়েনের অর্থ কী এবং এর মাধ্যমে ইরানবিরোধী যুদ্ধ আরও তীব্র হওয়ার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে কি না তা দেখে নেয়া যাক।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক উপস্থিতির অংশ হিসেবে প্রায় ১৯টি স্থানে তাদের স্থায়ী ও অস্থায়ী ঘাঁটি রয়েছে। ১৯৫৮ সালে বৈরুতে লেবানন সংকটের সময় থেকেই এই অঞ্চলে মার্কিন সেনার পদচারণা। চলতি বছরের শুরু থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন রণতরীসহ বিভিন্ন যুদ্ধজাহাজ আরব সাগরে পাঠিয়ে অস্থিরতা বাড়িয়ে দিয়েছে। ওপেন সোর্স গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, ফেব্রুয়ারির পর থেকে ১২০টির বেশি বিমান মোতায়েন করা হয়েছে, যা ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় সামরিক সক্রিয়তার ইঙ্গিত। এর মধ্যে এফ-৩৫, এফ-২২ স্টেলথ যুদ্ধবিমান ও আকাশপথে নজরদারির জন্য বিশেষ বিমান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক তানিয়া নুরি জানিয়েছেন, এ নতুন মোতায়েনে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানও রয়েছে।
মার্কিন বাহিনীর এই রণসজ্জার তৃতীয় ধাপে ছিল তিনটি পৃথক সামরিক ইউনিট। এর মধ্যে ত্রিপোলি অ্যাম্ফিবিয়াস রেডি গ্রুপ ও ওয়াস্প শ্রেণির ইউএসএস বক্সারসহ ১১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট উল্লেখযোগ্য, যা প্রায় ৪ হাজার ৫০০ অতিরিক্ত মেরিন ও নাবিক যুক্ত করেছে। এছাড়া উত্তর ক্যারোলিনার ফোর্ট ব্র্যাগ থেকে ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের প্রায় ২ হাজার সেনাও এই তালিকায় রয়েছে। সব মিলিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত ৭ হাজার সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।
কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে ইরান সম্প্রতি হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও জব্দ করা সম্পদ ফেরত পাওয়ার দাবি জানালেও ট্রাম্প প্রশাসন তা প্রত্যাখ্যান করেছে। ওয়াশিংটন চায় পারমাণবিক ইস্যুসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও আলোচনার অন্তর্ভুক্ত হোক। সামগ্রিকভাবে, পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, কোনো চুক্তি বা সমঝোতার পরও মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা বা সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়ার আপাতত কোনো পরিকল্পনা নেই। একই সময়ে সংঘাত আরও বাড়ানো এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ দুই পথই বিবেচনা করছে উভয় পক্ষ।