মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণায় গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার এক বছর পার হয়েছে। তবে বাস্তবে চুক্তির মূল শর্তগুলোর অধিকাংশই এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে। ইসরায়েলি বাহিনীর ধারাবাহিক হামলা ও উত্তেজনার মাঝে ফিলিস্তিনিরা এখনো অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর ঘোষিত এই যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী, চুক্তির তিন দিনের মাথায় হামাস ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় আটক ২০ জন জীবিত জিম্মিকে মুক্তি দেয়। জিম্মিদের ফিরিয়ে আনা ছিল ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। অন্যদিকে, এই এক বছর গাজা সীমান্ত থেকে কোনো রকেট হামলার ঘটনা ঘটেনি, যা যুদ্ধবিরতির একটি বড় দিক। ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে হামাসের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও নিঃশেষ হয়ে গেছে এবং গাজার অধিকাংশ অবকাঠামো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর ঘোষিত যুদ্ধবিরতির গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো এবং সেগুলোর বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো। তাদের ভাগ্য নিয়ে দেশটির জনগণ দীর্ঘদিন উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় ছিলেন। শর্ত অনুযায়ী গাজা থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের কথা থাকলেও, তা হয়নি। অন্যদিকে, শা’থও নিজেকে অনেকটা আড়ালে রেখেছেন।
তবে সামরিক দিক থেকে পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী সীমান্ত এলাকায় একটি কমান্ড পোস্ট স্থাপন করে যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ করলেও ইসরায়েল সেনা প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। গাজায় হামলার মাত্রা কিছুটা কমলেও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অভিযান প্রায় নিয়মিতভাবেই চলছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১,৪৫০ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন।
রাজনৈতিক উত্তরণের লক্ষ্যে কারিগরি বিশেষজ্ঞ আলি শা’থকে প্রধান করে ‘নতুন গাজা প্রশাসনের জাতীয় কমিটি’ (এনসিএজি) গঠন করা হয়েছিল। জুলাই মাসে হামাস নিজেদের শাসন কাঠামো বিলুপ্ত করে প্রশাসনিক দায়িত্ব এই কমিটির কাছে হস্তান্তরের ঘোষণা দেয়। একই সময়ে সংগঠনটি অস্ত্র ত্যাগের ইচ্ছাও ব্যক্ত করে, যাকে ট্রাম্প একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে স্বাগত জানান। তবে নেতানিয়াহু প্রতিটি আগ্নেয়াস্ত্রসহ হামাসের পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের দাবি জানিয়ে চুক্তির বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করে আসছেন। বাস্তবে গাজার নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণ এখনো হামাসের হাতেই রয়ে গেছে এবং আলি শা’থও জনসমক্ষে খুব একটা সক্রিয় নন। জুলাইয়ে ফিলিস্তিনের ইসলামপন্থি সংগঠনটি নতুন নেতা হিসেবে খলিল আল-হাইয়াকে নির্বাচিত করে। এর কিছুদিন পর হামাস জানায়, তারা অস্ত্র ত্যাগ করবে।
পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার ধীরগতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ট্রাম্প ‘বোর্ড অব পিস’ নামে একটি নতুন সংস্থা গঠন করেন, যেখানে যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার এবং বুলগেরীয় কূটনীতিক নিকোলাই ম্লাদেনভকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়। ম্লাদেনভ বর্তমানে গাজার উচ্চ প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত।
আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা কাটেনি। ট্রাম্প তার নিয়ন্ত্রিত বোর্ডের জন্য ১০ বিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং উপসাগরীয় মিত্ররাও অনুদানের অঙ্গীকার করেছিল। সেপ্টেম্বরে এক বৈঠকে গাজার পুনরুদ্ধারের জন্য ২ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনা প্রস্তাব করা হয়, যার বাস্তবায়ন সময়সীমা ধরা হয়েছে ছয় মাস। তবে এখন পর্যন্ত পুনর্গঠনের জন্য এসব সহায়তার বড় কোনো অংশ গাজায় পৌঁছেছে বলে খবর পাওয়া যায়নি। বিদেশি সহায়তার সমালোচক ট্রাম্প জানুয়ারিতে তার নিয়ন্ত্রণাধীন বোর্ডের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।