লালমনিরহাট শহরের পুরান বাজারে এক অপূর্ব ধর্মীয় সম্প্রীতির দৃশ্য বিদ্যমান, যেখানে যুগ যুগ ধরে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে একটি মসজিদ ও একটি মন্দির। কেন্দ্রীয় কালীবাড়ী শ্রী শ্রী দুর্গা ও কালী মন্দির এবং পুরান বাজার জামে মসজিদের মধ্যে দূরত্ব মাত্র ৬ ফুট। একই আঙিনায় অবস্থিত এই দুটি উপাসনালয়ে আলাদা ধর্মের অনুসারীরা নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি পালন করে আসছেন, যা সাম্প্রদায়িক সৌহার্দের এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আলাদা ধর্মের মানুষের আলাদা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান দুটির অবস্থান মাত্র ৬ ফুট ব্যবধানে। কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূতও এই মন্দির ও মসজিদ পরিদর্শনে এসেছিলেন।
স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, ১৮৩৬ সালে পুরান বাজারে প্রথম কালীমন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯১৫ সালের দিকে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজন নামাজের জন্য মন্দিরের পাশে একটি ওয়াক্তিয়া মসজিদ গড়ে তোলেন, যা পরবর্তীতে পুরান বাজার জামে মসজিদে রূপান্তরিত হয়। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর একই প্রাঙ্গণে দুর্গামন্দির স্থাপিত হয়। এই পুরো আঙিনাটি ১২ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত, যার মধ্যে ৮ শতাংশ মন্দিরের এবং ৫ শতাংশ মসজিদের দখলে রয়েছে। একপাশে উলুধ্বনি, অন্য পাশে চলছে আল্লাহ তাআলার জিকির।
পূজারি দিলীপ চন্দ্র রায় জানান, ধর্মীয় সম্প্রীতির এই উজ্জ্বল উদাহরণ লালমনিরহাটের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। আজানের সময় থেকে নামাজের জামাত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মন্দিরের ঢাকঢোল ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার বন্ধ রাখা হয়। একইভাবে নামাজের পর মন্দিরের স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হয়। এই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের কারণে এখানে কখনো কোনো বিবাদ বা অপ্রীতিকর ঘটনার সৃষ্টি হয়নি। মসজিদে নামাজ আদায়ের সময় মন্দিরে বন্ধ রাখা হয় বাদ্যযন্ত্র বাজানো। এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, আজানের সময় থেকে নামাজের জামাত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মন্দিরের ঢাকঢোলসহ যাবতীয় শব্দ যন্ত্র বন্ধ থাকে।
মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম দুলাল ও পুরান বাজার জামে মসজিদের ইমাম আলাউদ্দিন আল আজাদ জানান, মন্দির-মসজিদের এই সহাবস্থান শুধু লালমনিরহাট নয়, বরং পুরো বাংলাদেশের জন্য এক আদর্শ নিদর্শন। তারা একে অপরকে সব কাজে সহযোগিতা করেন এবং জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে দর্শনার্থীরা এই দৃশ্য দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে এখানে আসেন। আরিফ সাবেরী, মনোয়ার হোসেন ও কমল চন্দ্র রায়ের মতো দর্শনার্থীরাও এই সম্প্রীতির পরিবেশ দেখে মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন। পুরান ঢাকা থেকে আসা দর্শনার্থী আরিফ সাবেরী (৫৫), মনোয়ার হোসেন, (৪৫) এবং কমল চন্দ্র রায় (৪৮)বলেন, তারা একই আঙিনায় মসজিদ-মন্দিরের কথা শুনে তা দেখতে ছুটে আসেন। এটি সত্যি বাংলাদেশের ইতিহাসে বিড়ল ঘটনা।
এদিকে, আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে জেলায় ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। জেলায় মোট ৪৭৬টি মণ্ডপে এবার দুর্গোৎসব উদযাপিত হবে। উপজেলাভিত্তিক মণ্ডপের সংখ্যার মধ্যে লালমনিরহাট সদরে ১৬২টি, আদিতমারীতে ১১৭টি, কালীগঞ্জে ৯৩টি, হাতীবান্ধায় ৭৩টি এবং পাটগ্রামে ৩১টি রয়েছে। ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে এই উৎসব শেষ হবে।
দুর্গাপূজার ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে জেলা প্রশাসনের ত্রাণ তহবিল থেকে প্রতিটি মণ্ডপের জন্য ৬০০ কেজি করে মোট ২ লাখ ৮৫ হাজার ৬০০ কেজি চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি হীরালাল রায় এবং বড়বাড়ী বাজার শিবকালী ও দুর্গা মন্দিরের সভাপতি নিমাই চন্দ্র পাল জানান, প্রশাসনের সহযোগিতায় শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে জেলা প্রশাসক মুহা. রাশেদুল হক প্রধান জানান, পূজাকে ঘিরে জেলার সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান জানান, প্রতিটি মণ্ডপে বিশেষ নজরদারি রাখা হবে এবং পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করবে। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্টের সভাপতি বাবু গুরুচরণ রায়ও উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন।