যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের প্রার্থীদের বিজয়ী করতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢালছেন বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক। গত জুলাই মাস থেকে এ পর্যন্ত তিনি দলটির বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে ২৭ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বেশি অনুদান দিয়েছেন, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩ হাজার ৪০৩ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার টাকার সমপরিমাণ। এই বিশাল অঙ্কের তহবিল মূলত সিনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা এবং ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসার জন্য ব্যয় করা হচ্ছে। যেসব রিপাবলিকান ভোটার সাধারণত কম ভোট দেন, তাদের কেন্দ্রে আনাই এর লক্ষ্য। তবে উভয় নির্বাচনেই এমন কিছু অনুদান দিয়েছেন, যেগুলোর তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
নির্বাচনী অর্থায়ন সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় প্রতিবেদন প্রকাশের পূর্বেই মাস্কের প্রতিনিধিরা নিউইয়র্ক টাইমসকে এই তথ্য জানিয়েছেন। নির্বাচনী এই ব্যয়ের হিসাব থেকে স্পষ্ট যে, এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইলন মাস্ক ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে বড় দাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে মাস্ক গ্রীষ্মকালে ‘সিনেট লিডারশিপ ফান্ড’-এ ১৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার অনুদান দিয়েছেন, যা কোনো একক দাতার কাছ থেকে আসা সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ। একই সময়সীমার মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থক সকল দাতার মিলিত অনুদানের চেয়েও মাস্কের এই একা দেওয়া অনুদান বেশি। এছাড়া ২০২৪ সালে গঠিত ‘আমেরিকা প্যাক’ নামক সুপার প্যাকের মাধ্যমে তিনি ৭ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বেশি ব্যয় করেছেন। মূলত বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের দ্বারে পৌঁছানোর কাজে এই অর্থ ব্যবহৃত হচ্ছে। একই সময়ে সংগঠনটির ডেমোক্র্যাট প্রতিদ্বন্দ্বী সব দাতার কাছ থেকে মিলিয়েও এর চেয়ে কম অর্থ সংগ্রহ করেছে। ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে মাস্কের প্রতিষ্ঠিত আমেরিকা প্যাকও বড় কর্মসূচি নিয়েছে।
নির্বাচনী চক্র ২০২৫-২৬ এর কেন্দ্রীয় কমিটিগুলোতে মাস্ক ইতোমধ্যে প্রায় ৩৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার দিয়েছেন। যদিও ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের জেতাতে প্রায় ২৯ কোটি ডলার ব্যয় করেছিলেন। মাস্কের এই অনুদানের বড় একটি অংশ এমন সব সংস্থায় যাচ্ছে যাদের দাতাদের নাম প্রকাশের বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে তাঁর মোট খরচের পরিমাণ প্রকাশিত তথ্যের চেয়েও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যদিও গত মে মাসে মাস্ক বলেছিলেন যে তিনি রাজনৈতিক অনুদান কমিয়ে দেবেন, তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। রক্ষণশীল প্রার্থীদের জেতাতে তিনি জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ‘কংগ্রেশনাল লিডারশিপ ফান্ড’-কে ২ কোটি ডলার, ‘লোন স্টার লিবার্টি প্যাক’-কে ১ কোটি ডলার, ‘রিপাবলিকান গভর্নরস অ্যাসোসিয়েশন’-কে ১ কোটি ডলার এবং ‘রিপাবলিকান অ্যাটর্নি জেনারেলস অ্যাসোসিয়েশন’-কে ২০ লাখ ডলার দিয়েছেন।
ইলন মাস্কের এই ব্যাপক অর্থায়নের পেছনে মূল লক্ষ্য ভোটারদের সচেতন করা এবং ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব ঠেকানো। আমেরিকা প্যাকের মুখপাত্র অ্যান্ড্রু রোমিওর মতে, ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হলে দেশ সমাজতান্ত্রিক ও সীমান্তহীন হওয়ার ঝুঁকির মুখে পড়বে। গত সপ্তাহে প্রায় তিন হাজার বেতনভুক্ত কর্মীর মাধ্যমে তারা ৬৫ লাখ বাড়ির দরজায় পৌঁছেছেন বলে জানা গেছে। কর্মীদের টেক্সাসে প্রতিটি দরজায় কড়া নাড়ার জন্য দেড় থেকে ৩ ডলার পারিশ্রমিক দেওয়া হয়েছে। সিনেটের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্য এবং প্রতিনিধি পরিষদের প্রায় তিন ডজন আসনে সক্রিয় রয়েছে সংগঠনটি।
নির্বাচনী প্রচারণার কৌশলে মাস্কের সংগঠন ট্রান্সজেন্ডার ইস্যু এবং সমাজতন্ত্রবিরোধী প্রোপাগান্ডাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ৪৮টি নির্বাচনী প্রচারপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ডেমোক্র্যাটদের ‘সমাজতন্ত্রী’ হিসেবে চিত্রিত করতে নিয়মিত আক্রমণ চালানো হচ্ছে। ডিজিটাল প্রচারের ক্ষেত্রে ভোটারদের নাম ধরে বার্তা পাঠানো এবং ‘আমেরিকা পাস’ নামের ডিজিটাল কার্ডের মাধ্যমে তথ্য সরবরাহ করা হচ্ছে, যা স্মার্টফোনের ওয়ালেটে রাখা যায়।
তবে গতবারের তুলনায় এবার মাস্ক নিজে নির্বাচনী প্রচারে কিছুটা আড়ালেই থাকছেন। ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত হলেও, এবারের নির্বাচনে নিজের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন তিনি। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সেও প্রার্থীদের পক্ষে তাঁর সরাসরি পোস্টের সংখ্যা মাত্র সাতটি, যেখানে গত বছর তিনি ধারাবাহিকভাবে সরব ছিলেন। এমনকি এবার বড় কোনো নির্বাচনী সফরও তিনি করেননি। বিপুল এই অর্থের জোরে নির্বাচনী প্রচারে আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে দলটি।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে তিনি শীর্ষ উপদেষ্টা ক্রিস ইয়ংকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছেন। এছাড়া আগের মতো ভোটারদের নগদ চেক দেওয়ার মতো বিতর্কিত উদ্যোগ এবার না থাকলেও, তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপই রিপাবলিকানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনে জয়লাভের জন্য এই বিপুল আর্থিক বিনিয়োগ ডানপন্থি রাজনীতিতে তাঁর প্রভাবের নতুন সংকেত দিচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। এতে ডানপন্থি রাজনীতিতে তার সমর্থন অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত মিলছে।