সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর পূর্বাঞ্চলীয় শহর ধাহরানে অবস্থিত একটি প্রশাসনিক ভবনে ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইয়েমেনের ইরানপন্থি হুতি বিদ্রোহীদের ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি কোম্পানির সদর দপ্তর কমপ্লেক্সের একটি অফিস টাওয়ারে আঘাত হানে। বুধবার দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয় এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। হামলায় ভবনটির ওপরের তিনটি তলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সীমিত পরিসরে আগুন ধরে যায়। তবে সৌভাগ্যবশত এই ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। মঙ্গলবার গভীর রাতে ঘটনার পরপরই সৌদি কর্তৃপক্ষ দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এর আগে রয়টার্সকে ছয়টি সূত্র জানিয়েছিল, তারা আরামকোর কমপ্লেক্সের আশপাশে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছে।
ধাহরানে অবস্থিত আরামকোর এই কমপ্লেক্সটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখান থেকে কোম্পানিটির বিশাল তেল অবকাঠামো, পাইপলাইন, শোধনাগার এবং রপ্তানি টার্মিনালগুলো তদারক করা হয়। ইয়েমেনে চলমান গৃহযুদ্ধে সৌদি আরব সরকারি বাহিনীকে সহায়তা দিচ্ছে, যার প্রতিশোধ হিসেবে হুতিরা গত এক সপ্তাহ ধরে সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বাড়িয়ে দিয়েছে। রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও একাধিকবার হামলা হয়েছে, যার মধ্যে গত শনিবারের ঘটনায় ১৩ জন নিহত হন। রিয়াদে হুতিদের দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার পর সেগুলোর ধ্বংসাবশেষে চারজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ। ওই ঘটনায় ১৫টি বাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আরামকোর ওই কমপ্লেক্সে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচালনাকেন্দ্র আছে। গত এক দশকে সৌদি আরবে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা ছিল শনিবার রিয়াদ বিমানবন্দরে চালানো ওই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। এর পর দেশজুড়ে আরও হামলার কারণে বিভিন্ন বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, ধাহরানে একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করে ধ্বংস করার পর সেটির ধ্বংসাবশেষ একটি আবাসিক এলাকায় পড়ে। বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, এতে রাজধানীর ১৫টি বাড়ি সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হুতি বিদ্রোহীদের মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি আগেই ধাহরানে আরামকোর সদর দপ্তর এবং রিয়াদের তেল শোধনাগারে হামলার হুমকি দিয়েছিলেন। বিদ্রোহীদের দাবি, সৌদি আরব সানায় ইয়েমেন পেট্রোলিয়াম কোম্পানির সাবাহ কেন্দ্রীয় স্টেশনে হামলা চালাচ্ছে, যার জেরে তারা কঠোর প্রতিশোধ নিচ্ছে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটও ইয়েমেনে হুতিদের সক্ষমতা নিষ্ক্রিয় করতে বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকেও হুতিদের বারবার হামলার কঠোর পরিণতির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
ইয়েমেনে নতুন করে শুরু হওয়া এই সংঘাতের মূলে রয়েছে হুতিদের দখল করা অঞ্চল পুনরুদ্ধারে সৌদি আরবের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযান। বিশেষ করে লোহিত সাগরের বাব আল মান্দেব প্রণালির নিকটবর্তী এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ এখন সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ রক্ষায় রিয়াদ মরিয়া হলেও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে।
বর্তমান এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর থেকে এই সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। এই সংকট নিরসনে ইরান মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে, যা গত রোববার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পৃথক বিবৃতিতে পুনরায় জানানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।