রাজধানীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে রেডিওথেরাপি সেবার সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। হাসপাতালটিতে থাকা ছয়টি রেডিওথেরাপি মেশিনের মধ্যে চারটিই দীর্ঘদিন ধরে অকেজো। কেবল দুটি সচল মেশিন দিয়ে কোনোমতে সেবা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এই সংকটের কারণে গত দেড় মাস ধরে হাসপাতালটিতে নতুন রোগীদের রেডিওথেরাপির জন্য নতুন কোনো নিবন্ধন বা সিরিয়াল দেওয়া হচ্ছে না। এই হাসপাতালে রেডিওথেরাপি বন্ধ রয়েছে বা আমরা দিতে পারবো না, তা তো জানতামও না। অথচ সংকট মোকাবিলায় সরকার কেন আগেই প্রয়োজনীয় মেশিনের ব্যবস্থা করেনি, সেই প্রশ্নও উঠছে।’।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে রেডিওথেরাপির অপেক্ষায় থাকা রোগীর সংখ্যা সাড়ে সাত হাজার ছাড়িয়েছে। বর্তমান সক্ষমতায় যেসব রোগী সিরিয়াল পেয়েছেন, তাদের চিকিৎসার তারিখ ২০২৮ সালের শেষ দিক পর্যন্ত গড়িয়েছে। এই দীর্ঘ অপেক্ষায় ক্যানসার চিকিৎসায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। অনেকে চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরেও যান। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনে স্বাস্থ্য খাতের বাজেটের সিংহভাগ ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যয় করা হবে বলে উল্লেখ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
গোপালগঞ্জ থেকে আসা মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল জানান, পেটে টিউমারের অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসক তাকে রেডিওথেরাপি দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু গত ১৯ অক্টোবর তিনি হাসপাতালে এসে শোনেন, নতুন রোগীদের এখন আর সিরিয়াল দেওয়া হচ্ছে না। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বেসরকারি হাসপাতালে থেরাপি নেওয়ার সামর্থ্য তার নেই, অথচ সরকারি হাসপাতালে এসেও এখন শূন্য হাতে ফিরতে হচ্ছে। পেটে টিউমার হওয়ায় অস্ত্রোপচারের পর কেমোথেরাপি নিয়েছেন তিনি।
টাঙ্গাইল থেকে আসা সাথিয়া খাতুন জানান, স্তন ক্যানসারের অস্ত্রোপচারের পর তিনি রেডিওথেরাপির জন্য আসেন। কিন্তু তাকে জানানো হয়েছে, মেশিন নষ্ট থাকায় দুই বছরের আগে সিরিয়াল পাওয়া অসম্ভব। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এমন দুরবস্থার কথা জানলে হয়তো কষ্ট করে গ্রাম থেকে আসতেন না। একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন টাঙ্গাইলের সাথিয়া খাতুন।
হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোস্তফা আজিজ সুমন জানান, আগের সিরিয়ালগুলোই ২০২৮ সাল পর্যন্ত বরাদ্দ হয়ে আছে।
তাই নতুন রোগীদের সিরিয়াল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, ক্যানসার রোগীদের দুই বছর অপেক্ষা করা চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিচারে মোটেও যুক্তিযুক্ত নয়। বর্তমানে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত তিনটি শিফটে আড়াইশ থেকে তিনশ রোগীকে থেরাপি দেওয়ার পরও বিপুল সংখ্যক রোগীকে ফেরাতে হচ্ছে। কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত তিন শিফটে প্রতিদিন গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ রোগীকে রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়।
চিকিৎসকদের মতে, ক্যানসার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়। অস্ত্রোপচারের পর রোগভেদে চার থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে এই থেরাপি শুরু করা প্রয়োজন। দীর্ঘ অপেক্ষায় চিকিৎসা ব্যাহত হলে রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা ও রোগ নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে রোগীর জীবনঝুঁকি বাড়ে।
গ্লোবক্যান ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর নতুন করে প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার ২৬৩ জন ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭ হাজার ৮২০ জন এবং নারী ৭৯ হাজার ৪৪৩ জন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসার জন্য সরকারি হাসপাতালের ওপর চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল মেশিন কিনে এই সংকট সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রশিক্ষিত রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, মেডিকেল ফিজিসিস্ট ও থেরাপিস্ট নিয়োগ দেওয়া জরুরি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, রোগীদের এই ভোগান্তি অত্যন্ত দুঃখজনক। সংকট কাটাতে বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নতুন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরকার সরদার শাখাওয়াত হোসেন বকুল জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে সরকারি হাসপাতালগুলোতে ১৭টি নতুন আধুনিক রেডিওথেরাপি মেশিন (লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর) বসানো হবে। এর মধ্যে ছয়টি ঢাকায় এবং বাকি ১১টি ঢাকার বাইরের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে স্থাপন করা হবে। আশা করা যায়, ২০২৭ সালের মাঝামাঝি নতুন মেশিন আসবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও জানান, ক্যানসার চিকিৎসার এই যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদানসহ প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, জীবনরক্ষাকারী এসব যন্ত্রপাতি স্থাপন বা পুরোনো মেশিন অপসারণের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা বরদাশত করা হবে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অনুযায়ী, ক্যানসারের রোগীদের চিকিৎসার একপর্যায়ে অর্ধেকেরও বেশি রোগীর রেডিওথেরাপির প্রয়োজন হয়। এই সুযোগ সহজলভ্য করা এবং মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করাই বর্তমান চ্যালেঞ্জ। এনআইসিআরএইচের চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, একজন রোগীর রেডিওথেরাপির কোর্স সম্পন্ন করতে সাধারণত চার থেকে আট সপ্তাহ সময় লাগে। সংস্থাটি এ চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি নিরাপদ ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।