জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি এবং সরকারের প্রস্তাবিত ২০২৭ সালের রাষ্ট্রীয় বাজেটে ব্যয় সংকোচনের প্রতিবাদে ফ্রান্সে আগামী ৫ নভেম্বর দেশব্যাপী ধর্মঘট ও বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে প্রধান প্রধান শ্রমিক সংগঠনগুলোর জোট। ফরাসি সংবাদমাধ্যম টিএফ১ ইনফো ও ল্য মোঁদের তথ্য মতে— সিএফডিটি, সিজেৎ, ফোর্স উভ্রিয়ের, উনসা এবং এফএসইউ যৌথভাবে এই আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি করেছে। এই ধর্মঘটে সরকারি ও বেসরকারি খাতের কর্মীদের পাশাপাশি তরুণ সমাজ ও অবসরপ্রাপ্তদের একযোগে রাস্তায় নামার আহ্বান জানানো হয়েছে। বাজেট ও ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে অসন্তোষ ফ্রান্সের ২০২৭ সালের রাষ্ট্রীয় বাজেট প্রস্তাবকে ঘিরেও শ্রমিক সংগঠনগুলোর আপত্তি রয়েছে। টিএফ১ ইনফোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের বাজেট পরিকল্পনায় ব্যয় সংকোচন এবং বিভিন্ন সুবিধা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার বিষয়টি শ্রমিক সংগঠনগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বেতন, ক্রয়ক্ষমতা ও সরকারি পরিষেবা নিয়ে সরকারের সঙ্গে শ্রমিক সংগঠনগুলোর বিরোধ কোন দিকে এগোয়, সেদিকেই এখন নজর থাকবে।
আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোর প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে সাধারণ কর্মীদের বেতন বৃদ্ধি, পেনশন ও সামাজিক সুবিধার আওতা সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সুরক্ষা, শিল্প খাতের বিকাশ এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো জরুরি সরকারি পরিষেবায় বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো। শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, নিত্যপণ্যের দাম ও মূল্যস্ফীতি অব্যাহতভাবে বাড়লেও সাধারণ মানুষের আয় ও সামাজিক সহায়তা সে অনুপাতে বাড়ানো হয়নি। সরকারি বাজেটের ভারসাম্য রক্ষার অজুহাতে শ্রমজীবী ও অবসরপ্রাপ্ত জনগণের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ চাপিয়ে দেওয়াকে তারা অন্যায় বলে মনে করছেন। অন্যান্য গণপরিবহন, স্কুল এবং সরকারি পরিষেবায় কী মাত্রায় বিঘ্ন ঘটবে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর পরবর্তী ঘোষণার ওপর নির্ভর করবে।
কর্মসূচি প্রত্যাহারের বিষয়ে ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুর সঙ্গে শ্রমিক নেতাদের একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও আলোচনার মাধ্যমে এখনো কোনো সমাধান মেলেনি। সিজেৎ-এর সাধারণ সম্পাদক সোফি বিনে কর্মীদের সংগঠিত করতে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে সাধারণ সভা ডাকার নির্দেশ দিয়েছেন। আন্দোলনকে জোরদার করতে একাত্বতা প্রকাশ করেছে দেশটির পরিবহন খাতের কর্মীরাও। জাতীয় রেল সংস্থা এসএনসিএফের চারটি প্রধান ইউনিয়ন— সিজেৎ কেমিনো, উনসা ফেরোভিয়ের, সুদ-রেল ও সিএফডিটি কেমিনো আলাদাভাবে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। ফলে ৫ নভেম্বর ফ্রান্সের দূরপাল্লার টিজিভি, তের, আন্তঃনগর ট্রেন এবং প্যারিসের ট্রান্সিলিয়াঁ ট্রেন পরিষেবা মারাত্মক বিঘ্নিত হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার পরও কর্মসূচি বহাল প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুর সঙ্গে আলোচনার পরও শ্রমিক সংগঠনগুলো ৫ নভেম্বরের কর্মসূচি বহাল রেখেছে। তবে কতটি ট্রেন চলাচল করবে বা কতটি যাত্রা বাতিল হবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত পূর্বাভাস নেই।
এর আগে অক্টোবর মাস জুড়েই ফ্রান্সে বেশ কয়েকটি বড় ধরনের সামাজিক আন্দোলন অনুষ্ঠিত হয়। গত শনিবারের কর্মসূচিতে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী ৪ লাখ ১০ হাজার এবং সিজেতের দাবি অনুযায়ী প্রায় ৮ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। ওই দিন পরিস্থিতি সামাল দিতে সারা দেশে অন্তত ৭০ হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয় এবং ১ হাজার ৩১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্যারিসসহ কিছু শহরে ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়। তবে, শ্রমিক সংগঠন সিজেৎ দাবি করেছে, গতকালের বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ। বিক্ষোভ ঘিরে শনিবার দেশটিতে অন্তত ৭০ হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল।
তবে ৫ নভেম্বরের কর্মসূচিটি সরাসরি পূর্ববর্তী বিক্ষোভের ধারাবাহিকতা নয়, বরং এটি শ্রমিক জোটগুলোর পূর্বনির্ধারিত একটি সুনির্দিষ্ট ধর্মঘট। মূল কর্মসূচির আগে আগামী ৩১ অক্টোবরেও কিছু স্বতন্ত্র আন্দোলনকারী গোষ্ঠী আলাদা বিক্ষোভের পরিকল্পনা করেছে। আগামী ৫ নভেম্বরের সর্বাত্মক ধর্মঘটে জনসেবা এবং পরিবহন ব্যবস্থার ওপর চূড়ান্তভাবে ঠিক কতটা প্রভাব পড়বে, তা কর্মীদের সরাসরি অংশগ্রহণের পরিমাণের ওপর নির্ভর করবে। তবে রেল ইউনিয়নগুলোর যোগদানের সিদ্ধান্তে আন্দোলনটি বড় রূপ নিতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে ৫ নভেম্বরের আন্দোলনে সামগ্রিক অংশগ্রহণের মাত্রা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তাই যাত্রীদের যাত্রার আগে সর্বশেষ সময়সূচি ও ট্রাফিক-সংক্রান্ত ঘোষণা যাচাই করার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। তবে ৫ নভেম্বরের কর্মসূচিকে ২৪ অক্টোবরের বিক্ষোভের সরাসরি পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।