শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫০ অপরাহ্ন
শিরোনাম
তাহসিফ সাউরীর নিখোঁজের ঘটনায় পিবিআইয়ের অভিযানে মোটরসাইকেল উদ্ধার তাহসিফের মৃত্যু: বন্ধু দ্বীপকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ পিবিআইয়ের জাপান ও সিঙ্গাপুর ম্যাচের জন্য ২৬ সদস্যের দল ঘোষণা ব্রাজিলের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পিবিআই হেফাজতে ‘বন্ধু’ দীপ: তাহসিফের মৃত্যু ইসরাইলের নির্বাচনে ঝুলে গেল ক্ষমতা, সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল না কোনো দলই জাপানে চার দিনের সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেতানিয়াহুর চেয়ে আইজেনকটের সরকারকে কম খারাপ ভাবছেন ফিলিস্তিনিরা রায়হান হত্যায় এসআই আকবরের মৃত্যুদণ্ড, পলাতক পাঁচ অভিযোগে জড়িত ব্যক্তি ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে বিএনপির মির্জা ফয়সল বিজয়ী সিটি করপোরেশনে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচলে নতুন সরকারি নীতিমালা

জাপানে চার দিনের সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

Reporter Name / ৬ Time View
Update : শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬

জাপানে চার দিনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সফর শেষ করে দেশে প্রত্যাবর্তন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার, অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ করার লক্ষ্যেই মূলত তাঁর এই সরকারি সফর অনুষ্ঠিত হয়। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) রাত ২টা ৪৮ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী, তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান এবং সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বিশেষ ফ্লাইট ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করে। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন গণমাধ্যমকে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন। ঢাকা মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে সহায়তা দিয়েছে দেশটি।

উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন আরও তথ্য জানান যে, প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানটি বৃহস্পতিবার জাপানের স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৫৫ মিনিটে টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক অভ্যর্থনা ও স্বাগত জানান সরকারের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ। তাঁদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলীসহ অন্যান্য বিশিষ্টজন।

দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক ও বিনিয়োগ সহযোগিতা

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির বিশেষ আমন্ত্রণে গত ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত পূর্ব এশিয়ার এই দেশটিতে সরকারি সফর পরিচালনা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরকালে তিনি দ্বিপক্ষীয় উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পাশাপাশি জাপানের বিভিন্ন রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক সাক্ষাৎ করেন। এছাড়া জাপানের শিল্প উৎপাদন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শিল্প কারখানা ও অবকাঠামোগত কেন্দ্র পরিদর্শন করেন।

গত ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী বাণিজ্য, পারস্পরিক বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, আধুনিক প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা এবং বৈশ্বিক নানা বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা সম্প্রসারণ নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা করেন। বৈঠকের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাতে এক ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েনের (যা প্রায় ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ) বেসরকারি বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়ে বিষদ কথা হয়। এই বৃহৎ প্রস্তাবিত বিনিয়োগ দ্রুত বাস্তবায়নের স্বার্থে জাপানের একটি প্রতিনিধি দলকে বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যাপারেও দুই নেতা সম্মত হন।

চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর

প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকালে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মোট ছয়টি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা দলিল ও চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর পাশাপাশি ৪৬ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন (যা প্রায় ২৯৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) মূল্যের দুটি ‘ইয়েন-লোন’ উন্নয়ন প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত হয়েছে। চুক্তিগুলোর বিস্তারিত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো

  • বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য একটি অত্যাধুনিক টহল জাহাজ সংগ্রহ করতে ২ দশমিক ১২ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন (প্রায় ১৩ দশমিক ৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) অনুদান সহায়তার চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।
  • বাণিজ্যিক ও ব্যবসায়িক পরিবেশের সার্বিক উন্নয়ন, কৃষি খাত, দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে প্রযুক্তিগত সহযোগিতার লক্ষ্যে বিভিন্ন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
  • পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় সহযোগিতার জন্য দুই দেশের মধ্যে একটি ‘লেটার অব ইনটেন্ট’ বা আগ্রহপত্র সাক্ষর করা হয়েছে।
  • জাপানের দেওয়া ঋণ সহায়তার দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশে ব্যবসায়িক পরিবেশ সুগম করা এবং ‘উপজেলা শাসন ও উন্নয়ন প্রকল্পের’ দ্বিতীয় পর্যায় সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।

ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট ও জেট্রো অর্থনৈতিক সংলাপ

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সফর সম্পর্কে অবহিত করে জানান, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের চুক্তির পাশাপাশি জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) মাধ্যমে দুই দেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৭টি বাণিজ্যিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এই উদ্যোগ এবং দুই দেশের প্রস্তাবিত প্রথম ‘ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট’ (ইপিএ) দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী ও সুসংহত কাঠামো প্রদান করবে। জাপান দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ও নির্ভরযোগ্য উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করে আসছে, যা এই চুক্তির মাধ্যমে আরও বেগবান হবে।

গত ২৮ অক্টোবর টোকিওতে অবস্থিত জেট্রোর প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক ফোরাম ডায়ালগে’ উপস্থিত থেকে প্রধান অতিথির বক্তব্য প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী। বক্তব্যে তিনি জাপানি উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশের প্রধান পাঁচটি অগ্রাধিকারমূলক খাতে বিনিয়োগের বিশেষ আহ্বান জানান। এই খাতগুলো হলো

  1. অটোমোবাইল উৎপাদন খাত
  2. জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো
  3. উচ্চ প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণা
  4. উচ্চগতির রেলপথ ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনা
  5. কৃষি পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প

বক্তব্যে বাংলাদেশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উপযোগী অনুকূল বাণিজ্যিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক ও সামাজিক সংস্কার বাস্তবায়নের স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

উন্নয়ন সহযোগী ও শীর্ষ উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলোচনা

জাপান অবস্থানকালে সেদেশের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, উন্নয়ন সংস্থার প্রধান ও শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক সম্পন্ন করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তাঁর সংবর্ধনা ও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জাপানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী তারো আসো, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সির (জাইকা) সভাপতি ড. আকিহিকো তানাকা, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর কাজুহিকো আমাকাওয়া এবং জেট্রোর সভাপতি সুসুমু কাতাওকা।

একইসাথে তৈরি পোশাক খাতের বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড ইউনিক্লো, মিতসুই অ্যান্ড কোং, সুমিতোমো করপোরেশন এবং জেরার মতো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মেগা জাপানি কোম্পানির শীর্ষ প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব আলোচনায় বাংলাদেশে শিল্প কারখানা তৈরি, প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উচ্চতর দক্ষতা উন্নয়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

শিল্প কারখানা ও লজিস্টিকস সুবিধা পরিদর্শন

জাপানের জ্বালানি অবকাঠামো ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করতে গত ২৭ অক্টোবর ফুত্তসুতে অবস্থিত জেরার সুবিশাল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ইচিকাওয়াতে অবস্থিত আধুনিক নিতসু লজিস্টিকস হাব পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। সফর তালিকার অংশ হিসেবে পরবর্তীতে তিনি নাগোয়া সফর করেন, যেখানে জাপানের বিখ্যাত অটোমোবাইল উৎপাদন সক্ষমতা প্রত্যক্ষ করতে টয়োটা মোটর করপোরেশনের ঐতিহ্যবাহী মোতোমাচি কারখানা এবং ‘টয়োটা মেমোরিয়েটিভ মিউজিয়াম অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড টেকনোলজি’ সরেজমিনে ঘুড়ে দেখেন। চার দিনের এই ঐতিহাসিক ও বহুমাত্রিক সফর শেষ করে তিনি সফলভাবে দেশে ফিরেছেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা