শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চলে একটি পরিত্যক্ত এলাকা থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষের কঙ্কাল ও হাড়গোড় উদ্ধার করা হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে জাফনার চেম্মানি এলাকায় খননকাজ চালানোর সময় শিশু ও নবজাতকসহ মোট ৫৭২ জনের দেহাবশেষ পাওয়া যায়। জানা যায়, গৃহযুদ্ধ চলাকালীন এক সেনাসদস্যের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই গণকবরটির সন্ধান মেলে, যিনি নিজেও এক তরুণীকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ছিলেন।
উল্লেখ্য যে, ১৯৮৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত শ্রীলঙ্কায় চলমান গৃহযুদ্ধ দেশটিকে জাতিগতভাবে বিভক্ত করে ফেলেছিল। এই দীর্ঘ সংঘাতের সময় উত্তর-পূর্বাঞ্চলে স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে লড়াই করেছিল তামিল টাইগার বিদ্রোহীরা। তাদের দাবি ছিল, দশকের পর দশক ধরে সিংহলী-প্রধান সরকার তাদের ওপর চরম বৈষম্য চালিয়েছে। ২৬ বছরব্যাপী এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে প্রায় এক লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং নিখোঁজ হয়েছেন প্রায় ২৩ হাজার মানুষ, যাদের সিংহভাগই তামিল সম্প্রদায়ের। ১৯৯৫ সালে সেনাবাহিনী লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলম (এলটিটিই)-এর হাত থেকে জাফনা উপদ্বীপের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করে। অবশেষে ২০০৯ সালে টাইগারদের পরাজয়ের মাধ্যমে এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। তবে সংঘাতের সেই বছরগুলোতে উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই ভয়াবহ নৃশংসতার অভিযোগ রয়েছে।
নিখোঁজ প্রিয়জনদের সন্ধানে বহু বছর ধরে অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের আর্তনাদ এখন নতুন করে সামনে এসেছে। স্বজনহারানো এক অভিভাবক বলেন, “সে ছিল আমার একমাত্র ছেলে। তার কথা মনে করে আমি রোজ ঘুমের মধ্যে কেঁদে উঠি। তাকে ছাড়া আমার জীবন শূন্য।” ভুক্তভোগী পরিবারগুলো বছরের পর বছর ধরে তাদের নিখোঁজ স্বজনদের বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত ও ন্যায়বিচার দাবি করে আসছেন।
তবে অতীতের অপরাধগুলোর বিচার প্রক্রিয়ায় ধীরগতি নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো তীব্র সমালোচনা করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই মাসের শুরুতে প্রকাশিত তাদের এক প্রতিবেদনে জানায়, গুম, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের অসংখ্য মামলা দীর্ঘ সময় ধরে স্থবির হয়ে আছে। একই সাথে ভুক্তভোগী পরিবার এবং মানবাধিকারকর্মীরা নিয়মিত হুমকি ও ভয়ের পরিবেশের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
দীর্ঘ আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৮ সালে শ্রীলঙ্কা সরকার ‘অফিস অব দ্য মিসিং পারসন্স’ (ওএমপি) নামক একটি স্বাধীন তদন্তকারী সংস্থা গঠন করে। এ বিষয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রধান রোরি মাঙ্গোভেন বিবিসি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, “পরিস্থিতিটা এমন যেখানে ভুক্তভোগীরা খুবই হতাশ, কয়েক দশক ধরে বেদনা নিয়ে বেঁচে আছেন এবং অতীতের তদন্তের ওপর আস্থা হারিয়েছেন।” তিনি আরও যোগ করেন, আন্তর্জাতিক সহায়তা যুক্ত হলে তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে। তবে শ্রীলঙ্কার প্রতিটি সরকারই যুদ্ধকালীন ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি বরাবরের মতো নাকচ করে আসছে।
বর্তমানে এই গণকবরটি নিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছে। দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, আগামী সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ এই প্রতিবেদনটি আদালতে দাখিল করা হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গত ফেব্রুয়ারিতে শ্রীলংকার উত্তরাঞ্চলে যখন একটি গণকবরের সন্ধান মেলে, সেটি পরিকল্পিতভাবে খুঁড়ে তোলা কোনও কবরস্থান ছিল না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সে সময় জাফনার চেম্মানি এলাকায় একটি শ্মশানের পরিধি বাড়াতে খননকাজ করছিলেন শ্রমিকরা, আর তখনই তারা সেখানে হঠাৎ মানব দেহাবশেষ খুঁজে পেতে শুরু করেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অগাস্টের মধ্যে প্রত্নতত্ত্ববিদরা সেখানে খননের তৃতীয় ধাপ শেষ করেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সেখানে মৃতদের সঙ্গে তাদের নানা ব্যবহার্য জিনিসও পাওয়া যায়; যেমন: চুড়ি, স্কুলব্যাগ, দুধের বোতল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এটি শ্রীলংকায় এখন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া সবচেয়ে বড় গণকবর বলে মনে করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই গণকবরের অস্তিত্ব নিয়ে আগে কিছু গুঞ্জন ছিল।